সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল

১২ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি লাপাত্তা

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

আকরামুল ইসলাম, সাতক্ষীরা

সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের বরাদ্ধের ১২ কোটি টাকার দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ হলেও আসেনি যন্ত্রপাতি। ভারী এসব যন্ত্রাংশ সদর হাসপাতালের সার্ভে কমিটির যারা যন্ত্রপাতি গ্রহণ করেছেন তারাও জানেন না এসব ঘটনা। এসব যন্ত্র চলমান অবস্থায় বুঝে পেয়েছেন বলে সার্ভে কমিটি লিখে দিলেও তারা বলছেন স্বাক্ষর তাদের নয়।

গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের উপ-সচিব হাছান মাহমুদসহ ৩ সদস্যের একটি টিম সাতক্ষীরা হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে বরাদ্দকৃত টাকার যন্ত্রপাতি দেখতে চাইলে থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ে।

সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন ডা. রফিকুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তিন সদস্যের একটি টিম সদর হাসপাতালে আসেন। এরপর জানতে চান, বিগত ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ১২ কোটি টাকা বরাদ্ধের উপর ভারী যন্ত্রাংশ সরবরাহের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়। সেই টেন্ডার অনুযায়ী ঢাকার মার্কেন্টাইল ট্রেড কো. লি. এসব মালামাল সরবরাহের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। যথারীতি তারা ১২ কোটি টাকার স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন মালামাল সরবরাহ করেছেন এবং তা আপনারা বুঝে পেয়েছেন মর্মে লিখিত দিয়েছেন। এরপর পরিদর্শনে আসা কর্মকর্তারা বলেন, এসব মালামাল কোথায়? তারা তা দেখতে চান।

সিভিল সার্জন ডা. রফিকুল ইসলাম আরও জানান, ওই সময়ে আমি সিভিল সার্জনের দায়িত্বে ছিলাম না। কে ছিল খুজতে গিয়ে দেখি ডা. তৌহিদুর রহমান ছিলেন। তিনি ২০১৭ সালে ১৩ মার্চ থেকে ২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সাতক্ষীরায় সিভিল সার্জনের দায়িত্ব পালন করেছেন। আমি জানাই তিনিই বিষয়টি বলতে পারবেন। পরে সাবেক সিভিল সার্জন ডা. তৌহিদুর রহমান, সিভিল সার্জন অফিসের হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন, স্টোর কিপার এ কে ফজলুল হকও আসেন সিভিল সার্জন কার্যালয়ে।

সেখানে আরও ডাকা হয় যন্ত্রপাতি বুঝে নেওয়া সার্ভে কমিটির সদস্য ডা. ফরহাদ জামিল, ডা. আসাদুজ্জামান মেডিসিন ও ডা. শরিফুল ইসলাম সার্জনকে। তাদেরকে দেখানো হয়, আপনারা ভারী এসব যন্ত্রাংশ চলমান অবস্থায় বুঝে পেয়েছেন লিখে স্বাক্ষর করে দিয়েছেন। কোথায় সেসব যন্ত্রাংশ? তারা তিনজনই বিষয়টি জানেন না বলে পরিদর্শন কমিটিকে অবহিত করে বলেন, তাদের স্বাক্ষর নকল করা হয়েছে। এ স্বাক্ষর আমাদের নয়। আমরা এসব জানি না।

সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন অফিসের স্টোর অফিসার ডা. জয়ন্ত সরকার জানান, আমি স্টোর অফিসার হিসেবে মালামল গ্রহনের পর স্টোর কিপার ফজলুল হক সিভিল সার্জনের অনুমতি নিয়ে তা বিভিন্ন দপ্তরে পাঠাবেন। অথচ আমি জানি না বা এ ধরণের কোন যন্ত্রপাতি আমি গ্রহণ করিনি। তৎকালিন সিভিল সার্জন ডা. তৌহিদুর রহমান ও স্টোর কিপার ফজলুল হক এসব যন্ত্রাংশ গ্রহন করেছেন মর্মে অডিট টিম জানিয়েছেন। তবে এখন কিছু কার্টুন এসেছে তার মধ্যে কি আছে জানি না। সেগুলো আমরা কেউ গ্রহন করিনি।

তবে এমন ১২ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর সিভিল সার্জন অফিসের হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, ১৭-১৮ অর্থ বছরে সিভিল সার্জন ডা. তৌহিদুর রহমানের সময়ে উক্ত টাকার টেন্ডার আহবান করা হয়। সে অনুযায়ী ঢাকার মার্কেন টাইল ট্রেড কো. আমাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। তারা সরবরাহ করেছেন পোর্ট এ্যাবল এক্স-রে মেশিন ৪টি যার প্রতিটির মূল্য ২৩ লাখ টাকা। আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন ৪টি, সিলিং ওটি যন্ত্রাংশ এক সেট, নেবু লাইজার মেশিন ১৮টা, স্টীল ল্যাম্প ১টা, চোখ পরিক্ষার মেশিন ১টা যা প্রায় ৮৫ হাজার টাকা দাম, রেটিনোস্কপ ১টা, ডেন্টাল যন্ত্রাংশ এক সেট, সাকশান ইউনিট ১টা ও ওয়াটার বাথ রয়েছে। এসব পন্য চলতি অর্থ বছরের বিভিন্ন সময়ে হাসপাতালে এসেছে।

কোন যন্ত্রাংশই এখানে আসেনি, ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করা হয়েছে এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, সম্প্রতি আসা কিছু মেশিনপত্র বারান্দায় পড়ে আছে। এখন আসবে কেন-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিদেশ থেকে আনতে হয় তাই দেরি হয়েছে। তাহলে যন্ত্রাংশ সরবরাহের আগে বিল পরিশোধ হল কিভাবে এমন প্রশ্নে সদুত্তর তিনি দিতে পারনি নি।

এদিকে, এসব যন্ত্রাংশ বুঝে নেয়া সার্ভে কমিটির আহবায়ক ডা. আসাদুজ্জামান (মেডিসিন) জানান, এ বিষয় সম্পর্কে আমি বা আমরা কেউ জানি না। কবে কমিটি হয়েছে আর কারা করেছে, কি করেছে, তা বলতে পারবো না। তবে মন্ত্রনালয় থেকে অডিট টিম আসার পর জানতে পেরে গত বৃহস্পতিবার সিভিল সার্জন বরাবর লিখিত অভিযোগ করে বিষয়টি প্রতিকার দাবি করেছি।

কমিটির সদস্য সদর হাসপাতালের সাবেক আরএমও ডা. ফরহাদ জামিল জানান, আমাদেরকে ব্যবহার করে কেউ ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সাবেক সিভিল সার্জন ডা. তৌহিদুর রহমান জানান, বিধি মোতাবেক টেন্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ ও যথাযথভাবে মালামাল এসেছে এবং বুঝে নেওয়া হয়েছে। পার্ট পার্ট বিলও পরিশোধ হয়েছে। এখানে কোন দুর্নীতি বা অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়নি।

 

"