দুই হাত নেই তবুও স্বপ্ন পূরণ করতে চান স্বর্ণা

প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

ঈশ^রগঞ্জ (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

স্বর্ণার দুই হাত নেই। তবুও স্বপ্নের পথে কনুই দিয়ে কলম ঘুরিয়ে পরীক্ষায় খাতায় লিখে চলছে। প্রতিবন্ধকার মধ্যে বেড়ে উঠা স্বর্ণা শিক্ষক হতে চান। মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় দুই হাত হারানো স্বর্ণা এবার ভোকেশনাল বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। তার বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ^রগঞ্জে। উপজেলার রাজিবপুর ইউনিয়নের চরপাড়া গ্রামের দুলাল চন্দ্র সরকারের দুই মেয়ের মধ্যে ছোট সে। স্বর্ণা রাজিবপুরের ইসলামিয়া ট্যাকনিকেল এন্ড বিএম কলেজ থেকে ঈশ^রগঞ্জ ডিএস কামিল মাদরাসা পরিক্ষা কেন্দ্রে চলমান এইচএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। অন্যসহপাঠীদের সাথে বসে কনুই দিয়ে পরীক্ষার খাতায় লিখছে সে। গত সোমবার দুপুরে গিয়ে দেখে মেলে স্বর্ণার পরীক্ষা দেওয়ার এ দৃশ্য।

পরীক্ষা শেষে বেলা সোয়া ৪টায় পরীক্ষা কেন্দ্রের মাঠে দাঁড়িয়ে কথা হয় স্বর্ণা রানী সরকারের সাথে। স্বর্ণা জানায় তার হাত হারানোর গল্প। দারিদ্রতার কারণে স্বর্ণার বাবা দুলাল চন্দ্র সরকার গাজীপুর শহরের হারিনাল এলাকায় একটি ওয়ার্কশপের দোকানে কাজ নেন। সেখানে একটি ভাড়া বাসায় দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করতেন দুলাল। সেখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়ণরত অবস্থায় স্বর্ণা একটি চারতলা ভবন ঘেঁষে বয়ে যাওয়া বিদ্যুতের তাড়ে অসাবধানতাবশত ধরতে গিয়ে স্পৃষ্ট হয়ে নিচে পড়ে যায়। ওই সময় স্বর্ণার দুটি হাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুটি হাতই কনুই পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়। পরে কব্জিতে কলম ধরিয়ে লেখার চেষ্টা শুরু করে। কিছুদিন চেষ্টা করলে স্বর্ণা কনুই দিয়ে লিখতে শুরু করে। কনুই দিয়ে লিখেই পঞ্চম শ্রেণির পিএসসি পরীক্ষায় ৩.২৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। এরপর গাজীপুরের হরিনাল হাইস্কুল থেকে জেএসসিতে ৪.৬০ এবং এসএসসিতে ৩.৮৯ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে স্বর্ণার বড় বোন সুবর্ণার বিয়ে হয়ে গেলে অর্থভাবে তারা গ্রামের বাড়িতে চলে আসে। স্থানীয় বিএম কলেজে ভর্তি হয়। বাড়িতে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত শিশুদের প্রাইভেট পড়িয়ে তার সামান্য টাকা দিয়েই নিজের পড়ালেখা চালাচ্ছেন।

স্বর্ণা রানী সরকার জানান, মায়ের অনুপ্রেরণায় পড়ালেখা করে আলোর পথে হাটছেন। দুই হাত না থাকলেও কনুই দিয়ে লিখে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রথম প্রথম সহপাঠীরা ভিন্ন চোখে তাকিয়ে থাকলেও ধীরে ধীরে তাকে সবাই সহযোগিতা করতে শুরু করে। টিউশনি করে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া স্বর্ণা হতে চান আদর্শ শিক্ষক। তিনি বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা স্বত্বেও তিনি পড়ালেখা করছেন। শিক্ষক হতে পারলে নতুন প্রজন্ম তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হবে। স্বর্ণার মা স্বপ্না রানী সরকার বলেন, পড়ালেখা না করলে তার জীবন অন্ধকার হয়ে যেতো স্বর্ণার জীবন। তাই তিনি অনেক কষ্টে কনুই দিয়ে লেখানোর চেষ্টা শুরু করেন। এখন তার মেয়ে নিজের আগ্রহেই পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে।

ঈশ^রগঞ্জ ডিএস কামিল মাদরাসা পরীক্ষা কেন্দ্রের সচিবের দায়িত্বে থাকা মাওলানা শোয়াইব বলেন, স্বর্ণা সকলের জন্য অনুকরনীয়। নিজের দুটি হাত কনুই পর্যন্ত না থাকলেও পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে সে। তার এই আগ্রহ ও চেষ্টাকে সকলের সাধুবাদ জানানো উচিত।

 

"