দখল ও দূষণে অস্তিত্ব সংকটে কপোতাক্ষ

প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

ইয়াকুব আলী, চৌগাছা (যশোর)

খননের অভাবে যশোরের চৌগাছা উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কপোতাক্ষ নদের অস্তিত্ব দিন দিন ধ্বংস হতে চলেছে। অথচ এক সময় এ নদটির উপর দিয়ে বড় বড় জাহাজ, লঞ্চ, স্টিমার চলতো। নদটি ভরাট করার পাশাপাশি এর দু-পাড়ের জমি ভূমি দস্যুরা দখল করে বাড়িঘর নির্মাণ, মাছ ও কৃষি ফসল চাষাবাদ করছে। তবে রহস্যজনক কারনে প্রশাসন ওই সব ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে আইনগত কোন ব্যবস্থা নিতে পারছে না। ফলে নদটি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। এলাকাবাসী এ নদটি উদ্ধার ও খননের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।

স্থানিয়রা জানায়, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের এক সময়কার প্রমত্তা কপোতাক্ষ নদটি ৭৫০ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত ছিল। নদের দৈর্ঘ্য ছিল ২৬০ কিমি। নদটিই ছিল এ অঞ্চলের মানুষের একমাত্র আশা-ভরসা। জীবন জীবিকার প্রধান উৎস ছিল কপোতাক্ষ নদ। এ নদ দিয়ে নৌকা যোগে বিভিন্ন পণ্য আমদানি রপ্তানি করা হতো। নদ সংলগ্ন গ্রাম এলাকার হাজার হাজার মানুষ কপোতাক্ষ নদ থেকে মৎস্য আহরণ করে জীবন চালাতেন। কিন্তু এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মূল ভিত্তি কপোতাক্ষ নদ এখন কালের বিবর্তনে মৃত প্রায়।

এলাকাবাসির অভিযোগ, এক শ্রেণির অসাধু ভূমি দস্যুরা দীর্ঘদিন ধরে কপোতাক্ষ নদকে নানাভাবে ধ্বংস করে যাচ্ছে। প্রশাসন ধারাবাহিকভাবে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি বলেই অসাধু ব্যক্তিদের সাহস সীমাহীনভাবে বেড়ে গেছে। তারা নির্দ্বিধায় কপোতাক্ষ নদে ধবংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে।

তথ্য অনুসন্ধান করে জানা গেছে, কপোতাক্ষ নদ ২০টি উপজেলা, ১০ টি পৌরসভা ও ৯৫ টি ইউনিয়নের উপর দিয়ে বয়ে গেছে। এর মধ্যে চৌগাছা তাহেরপুর থেকে ছুটিপুর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট উপজেলায় নদের অবস্থান রয়েছে প্রায় ২৩ কিলোমিটার। এ অঞ্চলের নারায়নপুর, পেটভরা, টেঙ্গুরপুর, চৌগাছা, কংশারিপুর, দিঘলসিংহা, মাশিলা, কদমতলা, কাবিলপুর, খলশিসহ অনেক স্থানে নদের জমি দখল করা হয়েছে। এমনও দেখা গেছে নদের মধ্যেই তৈরি করা হয়েছে পুকুর। চৌগাছা ব্রিজ সংলগ্ন, বাবু ঘাট, শ^শান ঘাট, মৎস্য বাজার এলাকায় নদের জমি দখল করে তৈরি করা হয়েছে আবাসন ও বহুতল ভবন। বীজ ঘাট সংলগ্ন এলাকায় রংপুরসহ ভিন্ন জেলা থেকে এসে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় নদ দখল করে বস্তি তৈরি করে বসবাস করছে। এছাড়া উপজেলা নদের সীমানার মধ্যে শতাধিক স্থানে বাঁশের পাটাতান দেওয়া হয়েছে। নদের ভিতরে ময়লা আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। নদী গর্ভে সেখানে সামান্য আছে সেখানে আবার কচুরী পানায় ভর্তি রয়েছে। পানি নিস্কাশনের কোন ব্যবস্থা নেই। বর্ষা মৌসুম আসলে নদের পানি ছাপিয়ে এলাকার কৃষি জমি ও বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড এ নদের দক্ষিনাঞ্চল খননের উদ্যোগ নিলেও এ অঞ্চলে কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। ফলে নদের স্বাভাবিক গতি হারিয়ে যাচ্ছে। নদের গতিস্রোত নষ্ট হওয়ার ফলে কিছু কিছু স্থানে পট কচুরিপানার সৃষ্টি হয়ে নদ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এসব অভিযোগ এ অঞ্চলের মানুষের।

নদ পাড়ের বসবাসকারী জেলে পরিমল কুমার, নিমাই বাবু, প্রদীপ কুমারসহ অনেকেই জানায়, নদ আছে কিন্তু নদেও খর¯্রােত নেই। নদের ভিতরে অঞ্চল বিশেষ মাত্র দেড়শত ফুট থেকে ২০ফুট পর্যন্ত টিকে আছে। যে কারনে ওই স্থানে সরকারি ও বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থা প্রতিবছর মাছ অবমুক্ত করে থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে প্রভাবশালীরা দখল করে মাছ চাষ করে। ফলে গরীব জেলেরা এ মাছ আহরণ করতে পারে না। নানা কারনে প্রতিনিয়ত কপোতাক্ষ নদ অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলছে। কিন্তু যেন দেখার কেউ নেই। যে কাননে আমরা ওই পেশা ছেড়ে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মাছ এনে মাজারে বিক্রি করে জীবন জিবীকা নির্বাহ করছি।

যশোর নদ উদ্ধার কমিটির সদস্য মাস্টার আব্দুল জলিল জানায়, কপোতাক্ষ নদটি ১২০ কিলোমিটার খনন করলে ফিরে পাবে তার নব যৌবন। এর ফলে নদ অববাহিকায় গড়ে উঠবে শিল্প কারখানার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ নদটি বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারবে।

এ বিষয়ে ইউএনও মারুফুল আলম বলেন, সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক আমরা দ্রুত কপোতাক্ষ নদকে দখলমুক্ত করা হবে। ইতোমধ্যে ভৈরব নদ দখলদারদেও উচ্ছেদ করা হয়েছে। বর্তমানে নদের অবৈধ দখলকারীদের নাম ঠিকানার তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তাদের নামে নোটিশ দেয়া হবে। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা এ নির্দেশনা না মানলে তাদের বিরুদ্ধে আইননুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। তবে এ ব্যাপারে সকলের সহোযোগীতা প্রয়োজন।

"