আশাশুনিতে এখনো হয়নি বাঁধ সংস্কার

ভাঙনঝুঁকিতে চার নদীর বেড়িবাঁধের ১৪ স্থান

প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

আকরামুল ইসলাম, সাতক্ষীরা

সাতক্ষীরা আশাশুনি উপজেলায় চারনদীতে পাউবোর বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার প্রায় এক বছর পার হলেও এখনো পাঁচ ফুটের বেশি অংশ ঝুঁকির মধ্যে। তিনমাস আগে কপোতাক্ষের বাঁধের প্রায় একশ ফুট এলাকা ভেঙে যাওয়ার পর স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে সংস্কার করে। এর এক সপ্তাহের মধ্যে তা নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় দিনে দুই বার জোয়ার ভাটায় প্লাবিত হন তীরবর্তী এলাকাবাসী।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি কোন কর্মকর্তাকে বাঁধ সংস্কার সম্পন্ন এলাকায় দেখা যায়নি। তবে পাউবো কর্মকর্তা বলছেন, উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোর তালিকা তৈরি করে মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে।

উপজেলার শ্রীউলা ইউনিয়নের হাজরাখালি পাউবোর বেড়িবাঁধ ভেঙে ছিল ২০১৮ সালের জুলাই মাসে। প্লাবিত হয়েছিল গ্রামের পর গ্রাম, ভেসে গিয়েছিল শতশত মাছের ঘের। ঘরবাড়ি ছেড়ে মানুষ আ¤্রয় নিয়েছিল উঁচু জায়গায়। এ সময় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গ্রামবাসি বাঁধ বেঁধে বাঁচার চেষ্টা করেন।

আশাশুনি উপজেলার মধ্যদিয়ে মরিচ্চাপ, খোলপেটুয়া, কপোতাক্ষ ও বেতনাসহ চারটি নদী প্রবাহিত। নদীবেষ্টিত এ উপজেলার অন্তত ১৪টি স্থানের বেড়িবাঁধ চরম ঝুঁকির মধ্যে। উপজেলা সদরের দয়ারঘাট, বলাবাড়িয়া, খাজরা, খাজরা জেলেপাড়া, আনুলিয়া মনিপুর, হাজরাখালি, চাকলাসহ ১৪টি স্পটে বাঁধ প্রতিবছর ভেঙে যায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত তিন মাস ধরে বেড়িবাঁধ সংস্কার না হওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের শতাধিক পরিবার। দিনে দুইবার জোয়ার ভাটার ভাসতে থাকা এলাকায় দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। গ্রামের গবাদিপশু এখন এলাকা থেকে হারাতে বসেছে। প্রায় তিন শতাধিক মাছের ঘের নষ্ট হওয়ায় অনাহারে দিনপাত করছেন এলাকার মানুষ।

বিষয়টিকে পাউবোর উদাসীনতাকে দায়ী করে আশাশুনি উপজেলার নব-নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান অসীম বরণ চক্রবর্তী বলেন, সময় থাকতে বাঁধগুলো মেরামত করা হয় না। বাঁধ ভাঙার পর কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেন।

প্রতাপনগরের সীমান্তবতী চাকলা গ্রামের কথা উল্লেখ করে এই জনপ্রতিনিধি বলেন, গ্রামটি দীর্ঘ কাল ধরে নদীর জোয়ারের পানির চাপে পাউবোর বাঁধ ভেঙ্গে এখন জোয়ার ভাটার পানিতে টইটম্বুর। বাঁধটি স্থায়ীভাবে নির্মাণ না করা হলে আশাশুনির মানচিত্র থেকে এলাকাটি হারিয়ে যেতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ভাঙ্গনের সঙ্গে কিছু সহযোগিতা করলেও সেটি কপোতাক্ষের প্রবল জোয়ারে বিলীন হয়ে যায়।

স্থানীয়রা সংস্কার প্রসঙ্গে জানান, গত তিন মাস ধরে ভাঙ্গন কবলিত বাঁধটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোন কর্মকর্তা এক পলক দেখতেও আসেননি। ভাঙন প্রতিরোধের দাবিতে এলাকাবাসী প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ ও মানববন্ধন করেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

ভাঙন কবলিত এলাকার মাগফুর রহমান, ইসমাইল হোসেন, হাবিবুর রহমান, মোস্তাফিজুর রহমান ও কালাম ঢালি বলেন, গত তিন মাস আগে কপোতাক্ষ নদীর প্রবল জোয়ারে একশত হাত বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। প্রাথমিকভাবে স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বাঁধ সংস্কার করলেও এক সপ্তাহের মধ্যে সেটি নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সেই থেকে দিনে দুই বার জোয়ার ভাটা চলছে। বর্তমানে সেখানে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটের পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ সংক্রমিত হতে দেখা যাচ্ছে। দ্রুত বাঁধটি সংস্কার করা না হলে সামনে বর্ষা মৌসুমে চাকলা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে যে বাঁধ দেওয়া আছে সেটিও ভেঙে পুরো প্রতাপনগর ইউনিয়ন প্লাবিত হতে পারে।

শিক্ষক আমিরুল ইসলাম জানান, চাকলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় হওয়ায় অনেক অভিভাবক তাদের বাচ্চাদের স্কুলে আসতে দিচ্ছেন না।

প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান শেখ জাকির হোসেন জানান, স্থায়ীভাবে মাটি না দেওয়ার ফলে মুহূর্তে বেড়িবাঁধ ভেঙে চাকলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। ২/৩ শত বিঘা চিংড়ি ঘের ও ফসলের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যায়। হাজার হাজার টাকার চিংড়ি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দেড় শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছে। আজ পর্যন্ত কোনদিন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোন কর্মকর্তা এখানে আসেননি।

এবিষয়ে আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মীর আলীফ রেজার ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যায়। জানতে চাইলে পাউবো সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান খান বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন আশাশুনি উপজেলাতে যে সকল ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ রয়েছে সেগুলো তালিকা তৈরী করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তাছাড়া অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর বাঁধ সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই বাঁধ সংস্কারের কার্যক্রম শুরু হবে। এছাড়া আমাদের সার্বক্ষণিক মনিটরিং টিম তদারকি করছে।

"