সৈয়দপুরে প্রভাবশালীদের দখলে রেলওয়ের জলাশয়

প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

জহুরুল ইসলাম খোকন, সৈয়দপুর (নীলফামারী)

সৈয়দপুর শহরের সাহেবপাড়া ও বাঁশবাড়ী মহল্লার মধ্যবর্তী রেলওয়ের জলাশয়ের বিস্তীর্ণ অংশ এরই মধ্যে চলে গেছে অবৈধ দখলে। বর্তমানে জলাশয়টির পূর্ব পাশের রাস্তা ঘেঁষে ময়লা আবর্জনা ও মাটি ফেলে ভরাট প্রক্রিয়া চলছে। অল্প দিনের মধ্যে বাকি অংশ স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাবে বলে মনে করেন এলাকাবাসী।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, অবৈধ দখলের ফলে সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে জলাশয়ের আয়তন। ফলে অতিবৃষ্টিতে এটি ভরাট হয়ে সংলগ্ন এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। এলাকায় বাসাবাড়িতে ঢুকে যায় নোংরা পানি। এ সময় উভয় পাশের একটি বড় অংশের মানুষ হয়ে পড়ে পানিবন্দি। আবার শুকনা মৌসুমে জলাশয়ের কচুরিপানা ও নোংরা পানি পরিণত হয় মশক উৎপাদনের কারখানায়।

সাবেক পৌর কাউন্সিলর গুড্ডু জানান, ১৩ ও ১৪নং ওয়ার্ডের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে অবস্থান জলাশয়টির। এক যুগ আগেও এর পানি ছিল স্বচ্ছ এবং গভীরতাও ছিল অনেক। যে কারণে কয়েকজন ব্যক্তি রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে অংশ বিশেষ বরাদ্দ নিয়ে মাছের চাষ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, বরাদ্দপ্রাপ্তদের কেউ কেউ কিছু অংশ ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। আবার ভরাট অংশের কিছু প্লট আকারে বিক্রি করে হাতিয়ে নিয়েছেন মোট অংকের অর্থ।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, জলাশয়ের কিছু অংশ কয়েকজনের নামে বরাদ্দ রয়েছে বলে এলাকায় প্রচার রয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, সময়মতো বরাদ্দ নবায়ন না করায় এবং খাজনা বকেয়া রাখায় বরাদ্দগুলো বাতিল হয়ে যায়। ফলে জলাশয়টি পরিত্যক্ত বেওয়ারিশ সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। আর এ সুযোগে চলছে অবাধ দখলবাজি। তবে এর পেছনে ইন্ধন রয়েছে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড দুটির জনপ্রতিনিধি ও রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কিছু অসাধু কর্মচারীর।

সূত্রটি আরো জানায়, জলাশয়টি যখন গভীর ও পূর্ণাঙ্গ অবয়বে ছিল তখন বর্ষা মওসুমে প্রাথমিক পানি সংরক্ষণের কাজ করতো এটি। এছাড়াও এ জলাশয়ের সঙ্গে একটি কালভার্টের মাধ্যমে যুক্ত ছিল পাশের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরের আরেকটি ডোবার সাথে। বর্ষা মৌসুমে মূল জলাশয়ের অতিরিক্ত পানি ওই কালভার্টের মাধ্যমে গিয়ে পড়ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরের ডোবায়। আর ওই জলাশয়ের সাথে পাশের ব্যাকবোন (বড় নালা) ড্রেনের সংযোগ থাকায় জলাশয়ের অতিরিক্ত পানি গিয়ে পড়ত ওই ড্রেনে। ফলে এলাকাটি থাকত জলবদ্ধতা মুক্ত। কিন্তু চার দলীয় জোট সরকারের সময়ে মূল জলাশয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির ডোবার সংযোগ রক্ষাকারী কালভার্ট ভেঙে ভরাট করে সড়কে পরিণত করা হয়। সেই সাথে ডোবাটি ভরাট করে সেখানে স্থাপনা নির্মাণ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।

১৪নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা উর্দু কবি ও মানবাধিকার কর্মী আশরাফুল হক বাবু বলেন, ‘স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ও জলাশয়টির আয়তন ছিল বিশাল। বর্ষায় এটি রূপ নিতো লেকের মতো। সেসময় শিশু-কিশোরসহ অনেকে গোসল করত জলাশয়ের স্বচ্ছ পানিতে। বিকেলে জলাশয়ের কালভার্টগুলোতে আড্ডা দিতো এলাকার মানুষ। কিন্তু দখল আর দূষণে এটি ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ভূমিখেকোরা এর চারপাশ ভরাট করে গড়ে তুলেছে গরুর খামার, বাসাবাড়ি, শিল্প প্রতিষ্ঠান। সেই সঙ্গে বাসাবাড়ির নালা-নর্দমার সংযোগ দেওয়া হয়েছে এ জলাশয়ে। এমনকি সংলগ্ন এলাকার অনেক বাড়ির সার্ভিস ল্যাট্রিনের সংযোগ দেওয়া হয়েছে জলাশয়ে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে এর পানিতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে এলাকাজুড়ে।

১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দ মঞ্জুর আলম বলেন, যেভাবে জলাশয় দিন দিন দখল হয়ে যাচ্ছে তাতে দেখা যায় কয়েক বছর পর এর আর অস্থিত্ব থাকবে না। যা এলাকার পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। যেহেতু জলাশয়টির মালিকানা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সেক্ষেত্রে আমাদের কিছুই করার নেই। এ ব্যাপারে পৌর মেয়র আমজাদ হোসেন সরকার জানান, সৈয়দপুর রেল বিভাগের সঙ্গে পৌর পরিষদের জমিসংক্রান্ত বিষয়ে দীর্ঘদিন থেকে মামলা চলে আসছে। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না।

 

"