গোমতী এখন মরা নদী

নদী দখল করে বনায়ন প্রতিরক্ষা বাঁধে স্থাপনা

নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ভেতর রয়েছে কমপক্ষে ২ হাজার স্থাপনা। এর কেনোটিই বৈধ না। এমনকি সরকারি অনুদানের টাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়েছেন অনেকে

প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

মারুফ আহমেদ, কুমিল্লা

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আন্তঃসীমান্ত নদী গোমতী এখন মৃত প্রায়। এ নদী কেন্দ্র করে গড়ে উঠে ছিল কুমিল্লা শহর। এক সময় বর্ষায় খরস্রোতের কারণে তীরবর্তী লাখ লাখ মানুষ ভাঙ্গনের শঙ্কায় প্রতিরক্ষা বাঁধ পাহাড়া দিতো। এখন শুষ্ক মৌসুমে নদীটির কোথাও হাঁটু পানি থাকে, আর বর্ষায় দুই কুল উপচে পড়ে না পানির ঢল। এ অবস্থায় প্রতিরক্ষা বাঁধে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করছেন কেউ, নদীর মালিকানা দাবী করে বনায়ন করছেন দীর্ঘ সময় ধরে।

বিভিন্ন নথি থেকে জানা যায়, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উত্তর-পূর্ব পার্বত্য অঞ্চলের ডুমুর এলাকায় উৎপন্ন গোমতী প্রায় ১৫০ কিলোমিটার সর্পিল পথ অতিক্রম করে কুমিল্লা সদরের কটকবাজারের কাছে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তারপর এঁকেবেঁকে কুমিল্লা শহরের উত্তর প্রান্ত এবং ময়নামতির পূর্ব প্রান্ত অতিক্রম করে বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দেবীদ্বার, মুরাদনগর উপজেলা হয়ে পশ্চিমে তিতাসের কিছুটা অংশ দিয়ে দাউদকান্দির শাপটা এলাকায় মেঘনায় মিলিত হয়েছে।

এক সময়ের কুমিল্লার দুঃখ গোমতী মহানগরীর গাংচর এলাকার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতো। বিগত ষাটের দশকের শুরুতে নদীটির গতিপথ পরিবর্তন করে নগরীর উত্তরপাশে চান্দপুর এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। কুমিল্লা শহরছাড়াও নদীটির ডান দিকে তিতাসের দাসকান্দি পর্যন্ত অংশে রয়েছে ৬৫ কিলোমিটার এবং বাম দিকে ইলিয়টগঞ্জ পর্যন্ত ৭৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য। নদীর প্রস্থ কটকবাজার থেকে দাউদকান্দির গৌরীপুর পর্যন্ত ৫০-৬০ এবং গৌরীপুরের পর থেকে মেঘনা পর্যন্ত অংশ ৭০-৮০ মিটার। মূল নদীটির গভীরতা ৭ মিটারের কিছু বেশী।

তবে ইউকি পিডিয়া জানাচ্ছে, ৯৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ নদীর গড় প্রস্থ ৬৫ মিটার। কুমিল্লায় এর প্রবাহমাত্রা ১০০ থেকে ২০ হাজার কিউসেক পর্যন্ত উঠানামা করে। কিন্তু বাস্তবে এই হিসাব মেলান কঠিন।

সরেজমিন নদী তীরের টিক্কাচর থেকে কালিকাপুরসহ বিভিন্ন স্থান ঘুরে জানা যায়, গত শতকের আশির দশকের শেষ সময় পর্যন্ত বর্ষায় গোমতীর দুই তীরে বসবাসকরা লাখ লাখ মানুষ নদী ভাঙ্গনের আতঙ্কে থাকতো। এ সময় প্রয়োজনীয় মূল্যবান মালামাল তাদের আত্মীয় স্বজনদের বাড়ি পাঠিয়ে দিন কাটাত। চান্দপুর এলাকার মোশাররফ, ময়নামতির বাজেবাহেরচর গ্রামের দিলীপ, ভান্তির কবীর, কাঠালিয়ার অনোয়ারসহ অনেকেই জানান, গত নব্বইয়ের দশকের পর থেকে নদীতে বর্ষাকালে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক থাকলেও প্রতিরক্ষা বাঁধ উপচে পড়ে না। শুষ্ক মৌসুমে নদীর অবস্থা এতটাই বেহাল যে, কোথাও কোথাও পানি হাঁটু সমান থাকে।

সীমান্ত এলাকার একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গোমতীর উজানে ভারত অভ্যন্তরে একাধিক বাঁধ দিয়ে শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদের জন্য পানি সরিয়ে নেওয়ায় পানি প্রবাহের মাত্রা একেবারেই কম থাকে। এছাড়া ষাটের দশকে বাংলাদেশে প্রবেশ মুখ কটকবাজার এলাকায় স্লুইস গেট বসিয়ে সোনাইছড়ি নামে একটি খালে পানি প্রবাহ সৃষ্টি করে ভারত। এতে গোমতী নির্ভর কুমিল্লার দক্ষিণাঞ্চেল কমপক্ষে ১০ হাজার একর জমির সেচ বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া পানি না উঠায় দিন দিন নদীর অভ্যন্তর দখল বিনোদন কেন্দ্র, বাসাবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, খামারসহ বহুতল ভবন নির্মান করেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কুমিল্লা অফিস সূত্র জানায়, নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ভিতর রয়েছে কমপক্ষে দুই হাজার স্থাপনা। এর কোনটিই বৈধ না। এমনকি সরকারি অনুদানের টাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়েছেন অনেকে। দিন দিন শুকিয়ে যাওয়ায় নদীর ভেতরেই বনায়ন করছেন। প্রতিদিনই যত্রতত্র মাটি কেটে বিক্রি করছে। ফলে নদীটির সৌন্দর্যও হারিয়ে গেছে।

পঞ্চাশ দশকের পাকিস্তান জাতীয় দল ও পরে মোহামেডান ক্লাবের ফুটবলার ময়নামতির সিন্ধুরিয়াপাড়া গ্রামের হুমায়ুন কবীর জানান, গোমতীতে নৌকা এক সময় এই অঞ্চলের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল। বড় বড় মাছ পাওয়া যেত নদীতে। সেগুলো এখন আর নেই।

সদর উপজেলার নদীপাড়ের বিষ্ণুপুর গ্রামের আব্দুল জলিল অভিযোগ করেন, সরকারের সুষ্ঠু নজরদারীর অভাবে ইচ্ছে মাফিক জায়গা থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করছেন প্রভাবশালী ইজারাদাররা। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের কুমিল্লা সদর উপজেলার বানাসুয়া এলাকায় রেল সেতু, পালপাড়া ব্রিজ, পীরযাত্রাপুর এলাকার ব্রিজের পাশ থেকে ড্রেজারে করে পুরো বছরজুড়ে বালু উত্তোলনের কারণে এ ব্রিজগুলো হুমকীর মুখে পড়েছে। এছাড়াও নদী তীরে ভারী বালু ও মাটি বহনকারী ড্রাম্প ট্রাক চলাচলে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত । এতে বাঁধ মেরামতে সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে প্রতিবছর।

জানতে চাইলে পাউবো কুমিল্লার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শাওন পালিত বলেন, জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রতিটি উপজেলায় নদী প্রতিরক্ষা বাঁধের ভিতর থাকা অবৈধ স্থাপনার তালিকা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসেই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান।

 

"