জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস

জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় উপকূলবাসী

‘কেউ কোনো দিন জেলেদের ঝড়, সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস সম্পর্কে সচেতন করতে আসেনি’

প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

দুর্যোগের প্রস্তুতির কৌশলসমূহ জানে না উপকূলের লক্ষাধিক মানুষ। ফলে দুর্যোগ রক্ষার সুফল পাচ্ছে না উপকূলবাসী। উপকূলের লক্ষাধিক মানুষ সমুদ্র ও সমুদ্র নিকটকর্তী স্থানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করে। প্রান্তিক এ জনগোষ্ঠী জানে না দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস, সুনামি, ভূমিকম্প, বজ্রপাত, সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস কি? প্রতি বছর সরকার দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস উদ্যাপনের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করে। কিন্তু যাদের সচেতন করা প্রয়োজন তাদের কাছে পৌঁছেনি সচেতনতার সতর্কবাণী।

আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি জানান, জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবসে সুফল পাচ্ছে না বরগুনার আমতলী তালতলীসহ উপকূলের লক্ষাধিক মানুষ। উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ায় অনাদিকাল সাইক্লোন, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে আমতলী ও তালতলীতে। এতে ব্যাপক জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ১৯৭০ সালে ১২ নভেম্বর আমতলী ও তালতলীর উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কোটি কোটি টাকার সম্পদ। সর্বশেষ ২০০৭ সালে প্রলয়ঙ্কারি ঘূর্ণিঝড় সিডরে আমতলী ও তালতলীর ২৯৭ জন মানুষ প্রাণ হারায়। নিখোঁজ রয়েছে ৪৯ জন এবং আহত হয় ২৫০০ জন মানুষ। ঐ সময় সবচেয়ে প্রাণহানি ঘটে তালতলীর বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী নিদ্রাসখিনা, আশারচর, জয়ালভাঙা ও ফকির হাট এলাকায়। এর একমাত্র কারণ অসচেতনতা। তবে যারা সাইক্লোন সেল্টারে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের প্রাণহানি ঘটেনি। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে সাগরে অবস্থানরত জেলেদের।

আমতলী ও তালতলী উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে। উপকূলের মানুষরা সচেতনতার দিক দিয়ে নিম্নমানের। এদের মধ্যে অনেকেই এখনো জানে না ঘূর্ণিঝড়, সুনামি, ভূমিকম্প, বজ্রপাত, সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস কি? সরকারের পক্ষ থেকে দূর্যোগ প্রস্তুতি সচেতনতা তৈরিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। যাদের সচেতন করতে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন তারা প্রশিক্ষণ পায় না এমনই অভিযোগ উপকূলবাসীর।

ফকিরহাট গ্রামের জেলে জসিম ফরাজী বলেন, সাগর সংলগ্ন আশারচরে মৌসুম ভেদে জাল ফেলি। এ জীবনে বহুবার বন্যার কবলে পরেছি কিন্তু সুনামি কি তা জানি না। তিনি অভিযোগ করে আরো বলেন, কেউ কোনো দিন জেলেদের ঝড়, সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস সম্পর্কে সচেতন করতে আসেনি।

তালতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার দিপায়ন দাস শুভ বলেন, উপকূলের জনগোষ্ঠীকে সচেতন করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং তিনি এ ব্যাপারে প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সু নজর কামনা করছেন।

এদিকে কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলগুলো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। গত তিন দশকে সামুদ্রিক ঘুর্নিঝড়, জলোচ্ছাস ও নদী ভাঙন সুন্দরবন উপকূলীয় জনপদগুলো লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। গ্রীন হাউস প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে এক দিকে যেমন সমুদ্র পৃষ্টের তলদেশ উঁচু হয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে নদ-নদীর নাব্যতা হারিয়ে গতিপথে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারনে সমুদ্রের পানি উপকূলীয় এলাকায় উপচে পড়ছে। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে লাখ লাখ মানুষ সহায় সম্বল হারিয়ে সর্বশান্ত হচ্ছে।

সূত্রমতে, ১৯৮৮ সালের ২৯ নভেম্বর সুন্দরবন উপকূলে প্রলংকরী সামুদ্রিক ঘুর্ণিঝড়, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল চট্রগ্রাম কক্সবাজার অঞ্চলে স্মরনকালের ভয়াবহ সামুদ্রিক ঝড়, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, খুলনার উপকুলে সিডরের তান্ডব এবং ২০০৯ সালের ২৫ মে খুলনা, সাতক্ষীরা উপকূলে আইলার ভয়াবহ জলোচ্ছাসে গোটা উপকূলীয় এলাকার প্রাকৃতিক দৃশ্যপট পাল্টে দিয়েছে। এর সঙ্গে নতুন মাত্রায় নদী ভাঙন যোগ হয়ে লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। কয়রা, দাকোপ, আশাশুনি ও শ্যামনগর এলাকায় প্রতিনিয়ত বেড়িবাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। উপর্যুপরি নদী ভাঙন কেড়ে নিচ্ছে শত শত একর কৃষি জমি, বসত ভিটা, চিংড়ি ঘের ও রাস্তাঘাট। শুকনো মৌসুমে কয়রার অনেক এলাকায় ভয়াবহ নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ সকল এলাকায় দিন যতই পার হচ্ছে উপকূলীয় এলাকার মানুষ জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে ততই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেকে জমি জায়গা হারিয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছেন।

দাতা সংস্থা ও জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো পরিদর্শন করে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও দুর্যোগের ঝুঁকিহ্রাস কমাতে সরকারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন। জলবায়ু ফান্ডের অর্থায়নে সরকার উপকূলীয় এলাকার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। দাতা সংস্থাগুলো এনজিওদের মাধ্যমে বাঁধ সংস্কার, কাঁচা রাস্তা নির্মাণ, ঝড় সহনশীল ঘর তৈরী, পয়নিস্কাশন কার্যক্রম বাস্তবায়ন, গভীর অগভীর নলকূপ স্থাপন, রেইন ওয়াটার হার্ভেষ্টিং প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি অনেক সংস্থা দেশের উপকূলীয় বেশ কয়েকটি জেলার মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হলে সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ ঝড় জলোচ্ছাস জনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে কিছুটা রেহাই পাবে। সম্প্রতি সরকারের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদীর কিনার ড্যাম্পিং করে বেড়িবাঁধে ব্লক বসানোর কারনে নদী ভাঙন কিছুটা কমেছে। উপকূলীয় এলাকার বেড়িবাঁধ রক্ষায় বিশ্বব্যাংকের বাস্তবায়নাধীন চলমান প্রকল্প চালু থাকলে জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারনে সৃষ্ট জলোচ্ছাসের ক্ষয়ক্ষতি থেকে এ অঞ্চলের জনসাধারনের জানমাল অনেকটা রক্ষা করা সম্ভব হবে।

উপজেলা দুর্যোগ ব্যাবস্থপনা কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. জাফর রানা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় এলাকায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষতির দিকটি বিবেচনায় এনে টেকসই প্রকল্প হাতে নিয়ে তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট রয়েছে।

 

"