খুলনার ২২ খাল গিলে খাচ্ছেন ৮১ প্রভাবশালী

সিটি করপোরেশনের ২০০৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি এক প্রতিবেদনে নগরীর খালগুলো দখলের জন্য ৮১ ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়

প্রকাশ | ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

মো. শাহ আলম, খুলনা ব্যুরো

স্বাধীনতার এক দশক আগে থেকেই বেড়েছে খুলনা নগরীর পরিধি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে খাসজমি ও খাল দখলের প্রতিযোগিতা। সব সরকারের আমলেই প্রভাবশালীরা খাল দখল করে অবৈধ স্থাপনা ও সুবিধাবাদীরা নানাভাবে নিজ নামে রেকর্ড করে অন্যের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। এভাবে নগরীর ২২টি খাল দখল করেছেন ৮১ জন প্রভাবশালী। এসব খালের অধিকাংশই এখন ড্রেনে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রতি বছর আষাঢ় থেকে আশ্বিন পর্যন্ত চার মাস নগরীর একটি বড় অংশে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এর দুর্ভোগ পোহায় দুই লাখের বেশি নগরবাসী।

এ খালগুলোর মধ্যে আছে নিরালা, ময়ূর, মান্দার, ক্ষেত্রখালী, মতিয়াখালী, লবণচরা, তালতলা, মিস্ত্রিপাড়া, নবীনগর, ছড়িছরা, লবণচরাগড়া, সবুজবাগ, মিয়াপাড়া পাইপের মোড়, বাস টার্মিনালের পশ্চিম পাশে, বাস্তুহারা, বাটকেমারি, সাহেবখালী, নারকেলবাড়িয়া, সুড়িমারি, ডুবি, হাতিয়া, মাথাভাঙা, মাস্টারপাড়া, হরিণটানা, খুদে, মজুমদার, চকমথুরাবাদ, নবপল্লী, ছোট বয়রা, শ্মশানঘাট, রায়ের মহল মোল্লাপাড়া, বিল পাবলা ইত্যাদি। খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) রেকর্ড অনুযায়ী, নগরীর খালগুলোর মালিক জেলা প্রশাসন। এর তদারকি দায়িত্বে আছে সিটি করপোরেশন।

এলাকাবাসীর সূত্র জানান, বাস্তহারা খাল স্লুচগেট খাল, গল্লামারি নর্থ খাল, কাস্টম ঘাট ইত্যাদি এলাকায় খালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। লবণচরা খালের এক অংশ ভরাট করে ওয়ার্ড অফিস ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র নির্মাণ কারা হয়েছে। রূপসায় সাহেবখালী খালের ওপর কেসিসি মার্কেট নির্মাণ ও কলেজিয়েট স্কুল খালের একটি অংশ দখল করেছে। পিটিআই মোড়ে খালের মুখ বন্ধ করে ওয়ার্ড অফিস নির্মাণ, ২৮ নং ওয়ার্ডের শেষ সীমানায় খালের ওপর নি¤œমাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া রেলওয়ে মার্কেট এলাকায় প্রবাহিত খালটির ওপর হলুদ ও মরিচের আড়ত গড়ে উঠেছে। সাবেক মেয়র শেখ তৈয়বুর রহমানের বাসভবনের পেছনের খালটি একজন সাবেক ডেপুটি মেয়র প্রভাব খাটিয়ে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। বয়রা শ্মশান ঘাট খালের মুখ বন্ধ করে গড়ে উঠেছে ইসলামীয়া কলেজ। নগর ভবনের পেছনে ড্রেনের ওপর একজন আইনজীবী গ্যারেজ নির্মাণ করেছে।

সিটি কর্পোরেশনের ২০০৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি এক প্রতিবেদনে নগরীর খালগুলো দখলের জন্য ৮১ ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়। এদের কেসিসি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে, পুলিশ পরিদর্শক, বনকর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী, সমিতি সবই আছে। ব্যক্তির মধ্যে আছেন কেসিসি সাবেক প্রশাসক মো. সিরাজুল ইসলাম, তেলতুল তলার মো. আলী আহমেদ, সাবেক খাদ্য কর্মকর্তা নিরালার মো. আবেদ আলী; বাগমারার মো. খলিলুর রহমান, আব্দুল মান্নান; খোলা বাড়িয়ার মো. শহিদুল ফকির, সাহেব আলী শেখ, বাদল, চপল, হেকমত গাজী, জব্বার হোসেন; হরিণটানার মো. আলমগীর, হাজী ইমান আলী; আলকাতরা মিল এলাকার আলেয়া খাতুন; হাজী বাড়ির মনিরুজ্জামান এলু, এরশাদুজ্জামান ডলার, সাগর, মিসেস আজিজ, আবুল হোসেন শেখ; নিরালার এলাকার আফতাব আলী, আবুল কালাম আজাদ, পুলিশ পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান, তালুকদার আব্দুল জলিল, মো. ইউসুব আলী, মো. নুর, অবসর প্রাপ্ত বন কর্মকর্তা মো. শাজাহান; সৈয়দপুর ট্রাস্টের লিজ হোল্ডার সাবেক কাউন্সিলর আনোয়ারুল কাদির খোকন ও মাথাভাঙ্গার ক্লীপ অধিকারী। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে, গোলাবাড়ি সমিতি, ৩১ নং ওয়ার্ড অফিস, যুব উন্নয়ন অধিদফতর, মহিলা ক্রীয়া কমপ্লেক্স, হার্ড টু রিচ প্রকল্প ইত্যাদি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে নিরালা খালের ওপর নির্মিত তিনতলা ভবনের মালিক পুলিশ পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে কেসিসির প্রতিনিধিকে জানান, ‘খালের জমি দখল করে বাড়ি করেনি। বরং কেনা সম্পত্তি থেকে দুইশতক জমি কম পাচ্ছি।’ আশরাফুল উলুম মহিলা জামাত উন্নয়ন সংস্থার প্রোপাইটার আশরাফ আলী বলেন, ‘খাল দখল করে স্থাপনা করিনি। এই স্থাপনা স্থলে খাল ছিল না।’ আল-আমিন মহল্লার খালের ওপর ২৫ ফুট দখল করে কাঁচা ঘর নির্মাণ ও কলা গাছ রোপন করেছেন অবসর প্রাপ্ত বন কর্মচারী মো. শাজাহান মিয়া। তিনি এ প্রতিনিধিকে বলেন, ‘খালের চিহ্ন রেখে মাটি ভরাট করে ঘর তুলেছি।’

জানতে চাইলে কেসিসির মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, নগরীর সিংহভাগ মানুষকে জলাবদ্ধতার কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সরকারের বিভিন্ন দফতরে সমন্বয়ে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। দখলদাররা যত বেশি প্রভাবশালী হোক না কেন, এ বিষয় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। খালের উপর থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে। এ বিষয়ে কেসিসির সূত্র জানান, অবৈধ দখলদারদের সতর্ক করিয়ে দেওয়া হয়েছে। নগরীর ময়ূর নদীর পাড়ে ইতিমধ্যেই একাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। বাকিগুলোও উচ্ছেদের প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া শিল্প শহর খালিশপুর এলাকায় অবৈধ দখলদারদের এক মাসের সময় দেওয়া হয়েছে।

ময়ূর নদী বাঁচাও কমিটির সদস্য সচিব ও স্থানীয় রাজনীতিক মো. খালিদ হোসেন বলেন, সুষ্ঠু পানি নিষ্কাশন ছাড়া জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হলে পরিবেশ বিপর্যায়ের মুখে পড়বে।

"