বাউফলে ২০০ কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি বেদখল

প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি

পটুখালীর বাউফল উপজেলার খাস খতিয়ানের প্রায় ২০০ কোটি টাকা মূল্যে ৩১২ একর ৭৫ শতাংশ জমি দখল করে নিয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে উপজেলার খাল, সড়ক, অফিসপাড়ার মানচিত্র। বিপন্ন হতে চলেছে কৃষিবান্ধব পরিবেশ। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে সরকারি এসব গুরুত্বপূর্ণ জমি দখল করে নিয়েছেন তারা। এ দখল প্রক্রিয়ায় গ্রাম পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী মহল জড়িত রয়েছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।

দখলকৃত জায়গার মধ্যে আছে উপজেলার কৃষিবান্ধব ছয়টি খাল, সাবরেজিস্ট্রি অফিসের সামনে, সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের পথ, বাউফল স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সামনে, জেলা পরিষদের ডাক বাংলোর সামনে দোকান তুলে ব্যবসা করছে। এছাড়া কালীশুরি বাজার, কনকদিয়াবাজার, বগাবাজার, কালাইয়া বাজার, ধুলিয়াবাজার, মমিনপুর বাজার, নগরেরহাট, হাজিরহাট বাজার।

সরেজমিন ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, প্রায় আশির দশক থেকে একটি প্রভাবশালী মহল বাউফল উপজেলার ভূমি অফিসের কপিতয় অসাধু কর্মকর্তার সহোযোগিতায় উপজেলা বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ ১ নম্বর খাস খতিয়ানের ৩১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমি দখলে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় শুরু করে। এতে শুরু করে ঘরবাড়ি, পান সিগারেটের দোকান ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

বাউফল উপজেলা সহকারী ভূমি অফিসের হিসাব অনুযায়ী, কালাইয়া বাজারে ৩ দশমিক ২০ শতাংশ জমির মধ্যে ১ দশমিক ২০ সম্পত্তি লিজ দেওয়া হয়েছে। ২ একর জমি কালাইয়া বন্দরে চান্দিনা ভিটি। এসব ভিটিতে চায়ের দোকান ফার্নিচার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে বন্দরের এক প্রভাবশালী মহল। এই জমিতে দোকান নির্মাণ বিষয়ে মৃত জামাল মৃধার পুত্র ও যুবলীগ নেতা মোহন মৃধা বলেন, সরকারি কোন সম্পত্তিতে নয়, তার বাবা এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সাফ-কবলা নিয়েছে। সেই সূত্রে মালিক হিসেবে কবলা সম্পত্তিতে ঘর তুলে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

কালীশুরি বাজারে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমি রয়েছে। এর মধ্যে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমি বন্দোবস্ত দেয় ভূমি অফিস। বাকি ৩ একর জমিতে কালীশুরি ইউনিয়নের যুব নেতা, জনপ্রতিনিধি ও এক গ্রাম পুলিশের বিরুদ্ধে ঘরবাড়ি তুলে বসবাসের অভিযোগ আছে। এ বিষয়ে যুবদল নেতা ও ইউনিয়ন সদস্য মাহবুব বলেন, কালীশুরি তহসিল থেকে একসনা লিজ নিয়ে তিনি ঘর করেছে।

একইভাবে কনকদিয়া বাজারে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ সম্পত্তির মধ্যে সরকার ১ একর ৬০ শতাংশ জমি বন্দোবস্ত দেয়। বাকি দশমিক ৯০ শতাংশ সম্পত্তি দখল করে ঘরবাড়ি, দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ভাড়া দিচ্ছে প্রভাবশালী একটি মহল। বগা বন্দরে ২ একর সম্পত্তি খোলাবাজার। দশমিক ১০ শতাংশ সম্পতিতে চায়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে স্থানীয় একটি মহল। বিলবিলাস বাজারের ২ একর ১৩ শতাংশ জমির মধ্যে ১ একর একসোনা লিজ দেওয়া হয়েছে। এক দশমিক ১৩ শতাংশ সম্পত্তি বেখল রয়েছে।

এদিকে প্রভাবশালীরা পৌর শহরের পরিবেশবান্ধব তিনটি খালের দুইপাশ দখল করে ঘরবাড়ি, দোকান ও সরকারি ঘাটলা নির্মাণ করে খালের পানি প্রবাহের পথ বন্ধ করে দিয়েছে বলে পৌরবাসীর অভিযোগ। কালাইয়া বন্দরের আলগী নদীর ডালিমা সেতুর উত্তর পাড়ের প্রায় দেড় কিলোমিটার জেগে ওঠা চর এরই মধ্যে একটি প্রভাবশালী মহল বিভিন্ন নামে লিজ নিয়ে দখল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কাশিপুর বাঁধের ওপর দুই পাশ ধরে প্রায় ২ শতাধিক পাকা স্থাপনা তৈরি করে জমজমাট ব্যবসা চালাচ্ছেন দখলকারীরা। একই ভাবে নওমালার ভাঙ্গাব্রিজে দুইপাশ, আশুরীরহাট বাজারের দুই পাশ, বদরঘাটা সেতু এবং মিলঘর সেতুর দুই পাশ দখল করে পাকা স্থাপনা তৈরি করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে ।

এ বিষয়ে কাশিপুর বাঁধের ওপর রডসিমেন্ট ব্যবসায়ী সানু মাঝি ও নাসির উদ্দিন চৌকিদার বলেন,লিজের জন্যে আবেদন করেছি জেলা প্রশাসকের কাছে। বরাদ্দ পেলেইে তো আমরাই পাব। কারণ ঘর তুলেছি, একসনা লিজও পাব ।

জানতে চাইলে প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কমরেড নেতা মোকছেদুররহমান অভিযোগ করে বলেন, ২০০৬ সালে ১/১১-এ যৌথবাহিনী অবৈধ দোকান উচ্ছে করে পরিবেশ ফিরিয়ে আনলেও রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় সরকারি সম্পত্তিতে পাকা স্থাপনা করে দখল নিয়েছেন প্রভাবশালীরা। ফলে পরিবশেবান্ধব খাল, সরাকারি স্থাপনা, জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাণ দখল করে নিয়েছে ।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক আবদুল হালিম বলেন, প্রাকৃতিকভাবে গড়া ওঠা খাল নদীর পানি প্রকৃতিকে রক্ষা করছে। চলমান নদীকে দখল করে বাধাগ্রস্ত করলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় হবে। এছাড়া হাসপাতাল, অফিসের পাশে স্থাপনা থাকাটা জনস্বাস্থ্য পরিপন্থি।

জানতে চাইলে বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পীজুস চন্দ্র দে বলেন, তিনি সদ্য যোগদান করেছেন। তিনি বলেন সরকারি নিয়মে একসনা লিজ নিয়ে কারো পাকা স্থাপনা করার নিয়ম নেই। তবে দখলদারদের তালিকা করে জেলা প্রশাসককে দেওয়া হবে। অনুমোদন পেলেই এসব অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে।

"