আমতলীতে নদ-নদী ও খাল মৃতপ্রায়

প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

মো.আবু সাইদ খোকন, আমতলী (বরগুনা)

বরগুনার আমতলী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে পানি সংকটে মরে যাচ্ছে দুই শতাধিক নদী ও খাল। অবৈধ দখল, দূষণ আর ভরাটের কারণে নদী ও খালগুলো সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে নৌ চলাচল। ফলে নদী ও খাল কেন্দ্রিক খেটে খাওয়া মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। এসব এলাকার কৃষকরা পানির অভাবে ইরি-বোরো চাষ করতে পারছেন না। এদিকে, বর্ষা মৌসুমে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। উপজেলার গোছখালী নদী, কুকুয়া নদী, হলদিয়া জলেখার খাল, কাদির খাঁর খাল, ছলেমানের খাল, মল্লিখ বাড়ীর খাল, রামজীর খাল, চাওড়ার কালী বাড়ী খাল, আঠারগাছিয়ার আমতলার খাল, হলদিয়ার জিনবুনিয়ার খাল, আমতলী সদর ইউপির মাইঠার খাল, আড়পাঙ্গাশিয়ার গোলবুনিয়া খাল, পূর্বচিলা হাসানিয়া মাদরাসার খাল ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে।

স্থানীয়রা জানান, নদী ও খাল দ্বারা বেষ্টিত অত্র উপজেলায় নৌপথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে খালগুলোর ব্যাপক ভূমিকা থাকলেও বর্তমানে খালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিগত ২০/২৫ বছরের ব্যবধানে খালগুলো জবর দখল হয়ে রাতারাতি কৃষি জমিতে পরিণত হয়েছে। উপজেলা ভূমি অফিস এ কাজে সহায়তা করায় খালগুলোর অস্তিত্ব হুঁমকির মুখে পড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার আওতাধীন রামনাবাদ ও পায়রা নদী থেকে উৎপত্তি হওয়া খালগুলো ৭টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মধ্যে দিয়ে শাখা-প্রশাখা ছাড়িয়ে প্রবাহিত হতো। খালগুলো প্রবাহমান থাকায় সহজেই পণ্য বহনে নৌকা, ট্রলারসহ অন্যান্য নৌযান যাতায়াত করত। সারা বছর খালগুলো কানায় কানায় পানিতে পূর্ণ থাকত। বছর জুড়ে খালের মাছ ধরে উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের জেলে পরিবার জীবিকা নির্বাহ করত। বর্ষাকালে খালের পানি উপচে পলি মাটি ফসলি জমিতে মিশে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পেত। শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা তাদের ক্ষেতে সহজেই খাল থেকে সেচ দিতে পারত। বর্তমানে খাল দিয়ে নৌকা চলে না, পড়ে না জমিতে পলিমাটি। ফলে উপজেলার হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি উর্বরতা শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষি জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করেও কৃষকরা কোন ভালো ফলন পাচ্ছে না।

সংশিষ্ট এলাকার ভূক্তভোগী কৃষকরা অভিযোগ করে জানায়, উপজেলা ভূমি অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং এলাকার ভূমি দস্যুরা নামে-বেনামে খালগুলো বন্দোবস্ত করে নিয়েছে। এরমধ্যে হলদিয়া ইউপির পূর্বচিলা গ্রামের তালগাছিয়া খালে এখনও ৫/৭ ফুট পানি রয়েছে। ওই খালটিও বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে ভূমি অফিস থেকে। বন্দোবস্ত গ্রহিতা প্রবাহমান খালটি আটকিয়ে এখন মাছ চাষ করছেন। কৃষকরা এ খালের পানি ব্যবহার করতে পারছেনা। একই এলাকার হাপুরারিয়া খালের পানি ব্যবহার করে কৃষকরা ইরি বোরো ধান চাষ করতো। সে খালটি ভূমি অফিস থেকে বন্দোবস্ত দেওয়ায় বন্দোবস্ত গ্রহিতারা খালটি ভরে সমতল কৃষি জমি করে ফেলেছে। ফলে এখানের কৃষকরা এখন আর ইরি বোরো চাষ করতে পারেন না।

এদিকে, নাব্য সংকটে অধিকাংশ খালই শুকিয়ে যাচ্ছে। ড্রেজিং না করায় প্রায় খালই ভরাট হয়ে গেছে। এই সুযোগে এলাকার ভূমিদস্যুরা খাল দখলের উৎসবে মেতে উঠেছে। মাটি ফেলে খালগুলো ভরাট করে ফেলায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। উপজেলার হলদিয়া, চাওড়া, গুলিশাখালীসহ অন্য ইউনিয়নের খালগুলো স্থানীয় প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা ভূমি অফিসের সহযোগিতায় বন্দোবস্ত নিয়েছে। খালগুলো বাঁধ দিয়ে ভরাট করে চাষাবাদ করা হচ্ছে। অপরদিকে বর্ষা মৌসুমে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়।

আমতলী সরকারী কলেজের (অব.) সহকারী অধ্যাপক আবুল হোসেন বিশ্বাস জানান, ২০/২৫ বছর পূর্বে নদী ও খাল দিয়ে বছরজুড়েই নৌ চলাচল করত। কিন্তু বছরের পর বছর পলি জমে এসব নদী, খাল-বিল ভরাট হয়ে গেছে। নদীপথে নৌকায় কম খরচে সহজলভ্য পরিবহন সুবিধা ভোগ করলেও এখন আর ওই সুবিধা নাই। এখন নদী ও খাল মরে যাওয়ার সাথে সাথে এলাকার প্রসিদ্ধ নৌবন্দরগুলোও মরে গেছে। সাথে সাথে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নৌকার মাঝিমাল্লা ও জেলেরা। একই সাথে দুর্ভোগে পড়েছেন নদী এলাকার কৃষকসহ নদীপাড়ের লাখো মানুষ। এখন তারা সড়কপথে বেশি খরচে পণ্য আনা-নেওয়া করেন। এতে পরিবহন খরচ বেশি পড়ায় পণ্যের দামও বেশি। যার প্রভাব গিয়ে পড়েছে ক্রেতাদের ওপর। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামতে নামতে এমন অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে এখন নদী ও খালগুলোতে চার মাসের বেশি পানি থাকে না।

স্থানীয় বে-সরকারী সংস্থা এনএসএস’র নির্বাহী পরিচালক শাহাবুদ্দিন পান্না বলেন, অবৈধভাবে দেওয়া বন্দোবস্তগুলো বাতিল করে খালগুলো খনন করলে প্রান্তিক কৃষক ও জেলেরা খালের পানি ব্যবহার করে রবিশস্যসহ ফসল উৎপাদন করতে পারবে। যা দেশের অর্তনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

আমতলী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কমলেশ মজুমদার বলেন, অনেকগুলো বন্ধোবস্ত কেস সরেজমিন তদন্ত করে অনিয়ম পেয়েছি। সেগুলো বাতিলের জন্য কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।

আমতলী উপজেলা খাসজমি বন্দোবস্ত কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. সরোয়ার হোসেন বলেন, মৃত খাল ও নদীগুলো খনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে এনে কৃষি ও জেলেদের জন্য উপযোগী করা হবে। যে বন্ধোবস্ত কেসগুলোতে অনিয়ম পাওয়া যাবে তা বাতিল করে খনন করা হবে।

 

"