গ্রামীণ নারী বিক্রেতাদের মোকাম

সপ্তাহে এক দিন অর্ধশত কোটি টাকার বাণিজ্য

প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

আব্দুল আলীম, নারায়ণগঞ্জ

তিন যুগ ধরে দেশের গ্রামীণ নারী কাপড় বিক্রেতাদের বড় পাইকারী মোকাম নারায়ণগঞ্জের ভুলতা এলাকার গাউসিয়া মার্কেট। এর মাধ্যমে নিজের অর্থনৈতিক অবস্থা বদল করেছেন অনেক নারী। সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার সারাদেশের প্রায় ৩০ হাজার নারী রূপগঞ্জের গাউসিয়া মার্কেটে এসে সমবেত হন। একদিনের মোকাকে একদিনেই পাইকারী কাপড় বিক্রি হয় প্রায় ৫০ কোটি টাকা। ক্রেতা, বিক্রেতা ও মার্কেট সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য জানা গেছে।

রাজধানী থেকে ২৪ কিলোমিটার পূর্বে রূপগঞ্জের ভুলতা এলাকার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশ ঘেষে গড়ে ওঠেছে বড় পাইকারী বাজার গাউসিয়া মার্কেট। মার্কেট কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৫ সালের ৪ জানুয়ারি গড়ে ওঠে গাউসিয়া মার্কেটের প্রথম ভবন। পরে ধীরে ধীরে ১২০ বিঘা জমির উপড় মার্কেট সম্প্রসারিত হয়। বর্তমানে গাউসিয়া-১ ও গাউসিয়া-২ মার্কেটে পাইকারি কাপড়, শাড়ি, ওড়না, লুঙ্গি, গামছা বিক্রি হয়।

মঙ্গলবার সরেজমিনে ঘুরে নারী ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে মিলেছে অভাবী নারীদের দারিদ্র জয়ের নানা গল্প। সকাল ৬ টায় মার্কেটে কথা হয় চল্লিশউর্ধ্ব আলেয়া বেগমের সঙ্গে। জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার গোয়ালপাড়া এলাকার বাসিন্দা আলেয়ার স্বামী মারা গেছেন ১৫ বছর আগে। ১৩ বছর ধরে গাউসিয়া মার্কেট থেকে পাইকারী কাপড় কিনে নিয়ে এলাকায় ফেরি করে বিক্রি করেন তিনি। এক সময় ‘নুন আনতে পান্তা ফুরান’ সংসারে ফিরেছে স্বচ্ছলতা। আলেয়া বেগম বলেন, ‘বাজান এহানতে কাপড় কিনা ভালাই আছি। দামে কম পাই। আর নাইলে কি হেই জামালপুরতে আহি।’ জানান, সংসারের ঘানি টানতে যখন হিমশিম খাচ্ছেন, তখন এলাকার শেফালী আক্তারের পরামর্শে গাউসিয়া থেকে কাপড় কিনে নিয়ে এলাকায় বিক্রি করতে শুরু করেন। বর্তমানে কাপড়ের বিক্রি করে সংসার চালানোর পাশাপশি তিন শতাংশ জমি কিনেছেন।

পটুয়াখালী আদালত পাড়ার নাছরিন বেগম। আদালত পাড়ার লঞ্চঘাটেই তার কাপড়ের দোকান। প্রতি মঙ্গলবারেই লঞ্চে প্রথমে ঢাকায় আসেন, পরে গাউসিয়া মার্কেটে। সপ্তাহে ১০-১৫ হাজার টাকার কাপড় কিনে নেন। নাছরিন বেগম জানান, ‘ভালাই আছি। ১০ হাজার টেকার কাপড় নিলে লাভ ভালাই অয়। অন্যহান থেইক্যা কাপড় কিনলে লাভ অয় না। হের লেইগ্যাই এহান থেইক্যা কাপড় কিনা নেই।’

এদের মতো চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকা হনুফা বেগম, যশোরের রহিমপুর এলাকার খোদেজা বেগম, মুন্সিগঞ্জের জুলি আক্তার, সিলেটের লতিফা বেগম, ঢাকার রায়েরবাগের রাশিদা বেগম সহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ৩০ হাজার নারী প্রতি মঙ্গলবার গাউসিয়া মার্কেট থেকে পাইকারী কাপড় কিনে নিয়ে যায়।

গাউসিয়া মার্কেটের দোকান মালিকরা জানান, গাউসিয়া মার্কেটে পাইকারী কাপড়ের দোকান রয়েছে ৩ হাজারের উপড়ে। তবে এসব দোকান সবগুলো খোলা থাকে মঙ্গলবার। অন্যদিনগুলোতে অধিকাংশ দোকান বন্ধ থাকে। মঙ্গলবারে একেকটি দোকানে বিক্রি হয় কমপক্ষে ১ থেকে দেড় লাখ টাকা। আবার কোন কোন দোকান ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা বিক্রি করে। নির্বাচনের সময় বেচাকেনা সামান্য কম ছিল। তবে এখন আবার ক্রেতা আসায় বেচা-বিক্রি বাড়ছে। আশা করছি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

সিটি প্রিন্ট শাড়ীর মালিক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘খরিদ্দার আগে আইতো সাপ্তায়-সাপ্তায়। গত কয়েক মাস ধইরা খদ্দেরারা মাসে এহেকবার আহে। আগে বেচবার পারতাম লাখ পাঁচেক টাকা। আর অহন বেচবার পারি লাখ খানেক টাকা।’ আরেক ব্যবসায়ী আশিকুর রহমান জানান, ‘প্রতি মঙ্গলবারে ৩ হাজার পাইকারী দোকানদার ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকার বেচাকেনা করে। সে হিসাবে প্রায় মঙ্গলবারে ৫০ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়।’

মার্কেটের ম্যানেজার আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘মার্কেটে সারাদেশ থেকে নারী ক্রেতারা আসে এটা ভাগ্যের বিষয়। তাই নারী ক্রেতাদের কথা চিন্তা করে নিরাপত্তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যেন ছিনতাই, চুরি কিংবা ডাকাতির ঘটনা না ঘটে। মার্কেটের পাশেই রয়েছে পুলিশ ফাড়ি। তাছাড়া রয়েছে নিরাপত্তাপ্রহরী।’

মার্কেটের মালিক মুস্তাফিজুর রহমান ভূইয়া দিপু বলেন, ‘গাউসিয়া মার্কেটের ৮০ ভাগ ক্রেতাই মহিলা। ঢাকার বাইরে থেকে যেসব নারীরা কাপড় কিনতে আসেন তাদের অনেক কষ্ট হয়। সেই বিবেচনা মাথায় নিয়ে পরিকল্পনা করেছি গাউসিয়ায় একটি মহিলা রেস্ট হাউস তৈরি করবো। কম খরচে মহিলারা এখানে রাত যাপন করতে পারবে। আর ব্যবসায়ীদের কথা চিন্তা করে মার্কেটের পাশেই তৈরি করা হবে এ্যাপার্টমেন্ট।’

 

"