আমতলীর পায়রা নদী

ডুবোচরে আটকে যাচ্ছে সমুদ্রগামী জাহাজসহ ফিশিংবোট

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি
ama ami

বরগুনার পায়রা ও বিষখালী নদীতে সৃষ্ট শত শত ডুবোচরের কারণে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে সমুদ্রগামী জাহাজসহ কয়েক হাজার ফিশিং বোট। ভাটার সময় এসব নৌযানকে ৫-৭ ঘণ্টা পর্যন্ত নদীর মাঝখানে নোঙর করে থাকতে হয়।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহনে দ্বিতীয় শ্রেণির নৌপথ হিসেবে স্বীকৃত আন্তঃজেলা নদী পায়রা। ৯০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ১২০০ মিটার গড় প্রস্থ সর্পিলাকার এ নদীটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বরিশাল, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলাকে সংযুক্ত করেছে। এর মধ্যে বরগুনা সদর ও আমতলী উপজেলা মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত পায়রা নদীর জলধারা ছোটবিঘাই, বড়বিঘাই, আয়লা পুরাকাটা, গুলিশাখালী, আমতলী পৌরসভা, বুড়িরচর, আড়পাঙ্গাশিয়া এবং পচাঁকোড়ালিয়া, ছোটবগী ও নিশানবাড়ীয়া ইউনিয়ন অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরে নিপতিত হয়েছে। অপর দিকে ঝালকাঠির সদর উপজেলা দিয়ে প্রবাহমান সুগন্ধা নদী থেকে উৎসারিত ১০৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য,৭৬০ মিটার গড় প্রস্থের সর্পিলাকার নদী বিষখালী। নদীটি বরগুনার রাজাপুর, কাঁঠালিয়া, বেতাগী, পাথরঘাটা উপজেলা দিয়ে বঙ্গোপসাগরে নিপতিত হয়েছে।

বরগুনার পশ্চিম সীমান্ত এবং পাথরঘাটার পূর্ব সীমান্তের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত বিষখালী নদী বামনা, কাঁঠালিয়া, বেতাগী উপজেলা এবং ঝালকাঠির সুগন্ধা হয়ে পিরোজপুরের বেকুটিয়া ও কচা নদীর সঙ্গে মিশেছে।

নদী দুটিকে কেন্দ্র করে বরগুনা, আমতলী ও পাথরঘাটায় গড়ে উঠেছে জেলে পল্লী। এসব জেলে পল্লীর হাজার হাজার ট্রলার প্রতিদিন নদী পাড়ি দিয়ে সাগর মোহনায় মাছ ধরার জন্য যাতায়ত করে। কিন্তু বিপত্তি ঘটে সাগর মোহনায় গিয়ে। আশারচরের কাছে পায়রা ও বিষখালীর মোহনা এলাকাজুড়ে ডুবোচরের সৃষ্টি হয়েছে। ভাটার সময় এ চরে পানি থাকে ১ থেকে দেড় ফুট। এ সময় কোনো ধরনের ট্রলার কিংবা নৌ-যান চলাচল করতে পারে না। নিরুপায় হয়ে তখন নদীর মাঝখানে তাদের নোঙর করে থাকতে হয়। নদী গবেষণার সংশ্লিষ্ট সংস্থার ধারাভাষ্য মতে, ২০০৭ সালে ভয়াবহ সিডরের রাতে মধ্যবঙ্গোপসাগরে প্রচন্ড ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি হওয়ায় তলদেশের বালু ওপরে চলে আসে। তখন ২০ থেকে ২৫ ফুট উচ্চতায় পানি আছড়ে পড়ে সাগর উপকূলীয় আমতলী, বরগুনা ও পাথরঘাটার বিভিন্ন জনপদ ও ফসলি জমিতে। ফসলি জমি ও বাড়িঘরে ১-২ ফুট বালুর আস্তর জমে ছিল এসব এলাকায়। তখন রক্ষা পায়নি পায়রা ও বিষখালী নদীও। নদী দুটির তলদেশে জমে ওঠে বিশাল বালুর স্তুপ। এর ওপর ধীরে ধীরে পলি জমে বর্তমানে ব্যাপক এলাকাজুড়ে ডুবোচরের সৃষ্টি হয়েছে।

নৌপথে চলাচলকারী বিভিন্ন চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আমতলীর ফেরিঘাট এলাকায় অসংখ্য ডুবোচরের সৃষ্টি হওয়ায় ফেরি চলাচলে ব্যাঘাত ঘটছে। ভাটার সময় প্রায় ২-৩ কিলোমিটার দক্ষিণে ঘুরে ফেরি চলাচল করতে হয়। অনেক সময় চরে আটকে গিয়ে জোয়ারের জন্য দু-এক ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। পুরো নদীই যেন ধীরে ধীরে চরে ভরে যাচ্ছে।

পায়রা নদীতে তিন যুগ ধরে মাছ ধরা পেশার সঙ্গে জড়িত নুর আলম বলেন, ‘এই নদীতে এক সময় ১০০-১৫০ হাত পানি ছিল, এহন আর হেই পানি নাই। মোরা মাছ ধইর‌্যা খাই এই নদী মইরা গেলে মোরা বাঁচমু কেমনে?’

নদীটির উজানের তুলনায় ভাটির দিক অধিক প্রসস্ত। বঙ্গোপসাগরের মিলিত হওয়া বিষখালী-বলেশ্বর মোহনায় লালদিয়া সমুদ্র সৈকত এবং পায়রা-বিষখালীর মোহনায় পদ্মবাবুগঞ্জচর। তিন নদীর মোহনায় এ চর দুটি স্বাভাবিক জোয়ারের পানি প্রবেশে বাঁধা সৃষ্টি করে। ফলে নদীর গভীরতা দিন দিন কমে যাচ্ছে।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানাগেছে, পায়রা নদীর চরপাড়ায় এক কিলোমিটার, বুড়িরচর ৫ কিলোমিটার, লোচা থেকে শুরু করে ওয়াপদা স্লুইজ গেট পর্যন্ত ২ কিলোমিটার, জাঙ্গালিয়া ২ কিলোমিটার, ডালাচারা থেকে তিতকাটা পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিশাল ডুবোচর রয়েছে। এ ডুবোচরের কারণে নদীতে লঞ্চ, ফেরি ও ট্রলার চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে।

বরগুনা বিআইডব্লিউটির পোর্ট অফিসার মো. মামুন অর-রশিদ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ডুবোচরের কারণে পায়রা নদীর স্বাভাবিক গতিপথ হ্রাস পেয়েছে। ডেজিং করে পায়রা নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

"