রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্থানীয়দের ছাঁটাই নানা অভিযোগ এনজিওর বিরুদ্ধে

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া (কক্সবাজার)
ama ami

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩০টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চাকরিরত স্থানীয়দের গণহারে ছাঁটাই করছে বিভিন্ন এনজিও সংস্থা। ইতিমধ্যে বেশির ভাগ এনজিওয়ে স্থানীয় কোটায় চাকরি পাওয়াদের ছাঁটাই করে ফেলেছে। আর কিছু সংখ্যক যারা আছে তারাও আছে হুমকিতে। প্রজেক্ট শেষ, বাজেট বরাদ্দ না থাকা এবং স্থানীয়দের মধ্যে যোগ্যলোক না থাকার কারণ দেখিয়ে এই গণ ছাঁটাই করছে সংস্থাগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা। বিভিন্ন সংস্থার কর্মকার্তা ও কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য জানা যায়।

অভিযোগ আছে, সংস্থায় উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বাইরে থেকে আসা কর্মীদের বাইরে রক্ষা করছে। এছাড়া নিয়ম বর্হিভূত ভাবে শূন্য স্থানে সরাসরি রোহিঙ্গাদের নিয়োগ দিচ্ছেন।

কক্সবাজার শহরের টেকপাড়ার বাসিন্দা নুরুল আবছার বলেন, আমি ৯ মাস থেকে একটি এনজিওর সঙ্গে কাজ করছি। মূলত রোহিঙ্গা ক্যাম্প ভিত্তিক আমাদের কাজ। কষ্ট হলেও বেতন ভাতা ভাল ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে সেই এনজিও থেকে আমাকেসহ কয়েকজনকে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাস থেকে আর চাকরি নাই। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা বলছেন দাতা সংস্থার বাজেট বরাদ্দ শেষ হয়েছে, তাই প্রজেক্ট চলবে না। আর যদি কোন মতে চলেও তাহলে সীমিত আকারে চলবে, তাই অনেককে চাকরিতে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এই এনজিও কর্মী অভিযোগ করে বলেন, সেই এনজিওতে স্থানীয় ছাড়াও বিভিন্ন জেলা থেকে আসা কমপক্ষে ৫০ জন কর্মচারী আছে যারা উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিকট আত্মীয়-স্বজন। তাদের কারো চাকরি যায়নি।

এলাকার এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে একটি আন্তর্জাতিক এনজিওর হয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চাকরি পান রামু এলাকার নাসরিন সুলতানা। ক্যাম্পে সকাল ৮ টায় পৌঁছালে বাসায় ফিরেন সন্ধ্যায়। তারপরও পরিবারকে কিছুটা আর্থিক সুবিধা দেওয়ার জন্য চাকরি করেন তিনি। পারিবারে অর্থনৈতিক সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, এখন হঠাৎ করে শুনতে পাচ্ছি আগামী মাসে নাকি প্রজেক্ট বন্ধ হচ্ছে, তাই শুধু স্থানীদের নাকি ছাঁটাই করা হবে।

তিনি বলেন, ক্যাম্পে ইতিমধ্যে অসংখ্য রোহিঙ্গাকে চাকরি দেওযা হয়েছে, ফলে রোহিঙ্গারা আমাদের সঙ্গে খুবই বাজে ব্যবহার করে। এছাড়া সংস্থার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার ভাগ্নিকে যশোর থেকে এনে আমাদের উপরে সুপার ভাইজার পদে রেখেছে, তাকে সমস্ত সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়, তিনি ৪ ঘন্টা কাজ করলেও কোন সমস্যা নাই। মূলত আমাদের যারা স্থানীয় লোকজনকে এনজিওতে চাকরি দিয়েছে ৯০% মাঠ পর্যায়ে। উচ্চ পদস্থ সব কর্মকর্তা ভিন্ন জেলার। সে জন্য আমাদের কথা বলার কেউ নাই। কিন্তু ঠিকই ভিন্ন জেলার ছেলে মেয়েরা চাকরী করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এমএসএফ এনজিওতে কর্মরত অন্তত ১০ জন স্থানীয় কর্মী বলেন, গত ২ দিনে আমাদের ৫০ জনের মত স্থানীয়দের বলে দিয়েছে আগামী ৩১ জানুয়ারির পর চাকরি নাই। আমাদের স্থলে রোহিঙ্গাদের নিয়োগ দেবে।

এই প্রক্রিয়াকে ‘দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র’ উল্লেখ করে তারা অভিযোগ করেন, ‘ইতিমধ্যে অনেক এনজিও থেকে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা ভাল বেতনে ক্যাম্পে চাকরি করছে, তারাই প্রত্যাবাসনের বিরুদ্ধে সমস্ত ভূমিকা রাখে। মূলত আমরা তাদের অনেক ষড়যন্ত্রের কথা জেনে ফেলায় এখন রোহিঙ্গা যুবক-যুবতীকে চাকরি কাজ করানোর টার্গেট নিয়েছে।

জানতে চাইলে উখিয়ার সুজন সভাপতি নুর মোহাম্মদ সিকদার বলেন, শুরু থেকেই আমি রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন এবং স্থানীয়দের কাজে লাগানো ও ক্ষতিপূরণ দানের দাবিতে সোচ্চার আছি। গত কয়েক দিনে অনেক ছেলে মেয়ে আমাকে ফোন করে কান্নাকাটি করছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থেকে তাদের চাকরি চলে গেছে।

এই সমাজকর্মী বলেন, আমি নিজে খবর নিয়ে জানলাম, এনজিওর কর্মকর্তারা বলছেনÑপ্রজেক্ট শেষ, নতুন বরাদ্দ কম তাই কিছু ছাঁটাই করতে হচ্ছে। সেখানে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, যদি ১০০ জনের মধ্যে ২৫ জন স্থানীয় থাকে ৭৫ জন বাইরের, তাহলে ছাঁটাই করতে হলে রেসিও অনুযায়ী করতে হবে অর্থাৎ ১০ জন স্থানীয় বাদ পড়লে ৩৫ জন বাইরের চাকরিজীবী বাদ পড়বে কিন্তু সেটা না করে ২৫ জনই স্থানীয়রা বাদ পড়ছে। তিনি বলেন, এনজিওর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আগে রোহিঙ্গাদের ভাষা বুঝতেন না, কিন্তু এখন অনেক বিদেশীও রোহিঙ্গার ভাষা শিখে গেছে, তাই স্থানীয়দের বাদ নিয়ে তারা সরাসরি রোহিঙ্গাদের নিয়োগ করছে। এতে তারা সরকারের বিরুদ্ধে বা প্রত্যাবাসন বিরোধী সব কাজ নিজেদের মধ্যে করতে পারবে। এটা কোন ভাবেই হতে দেওয়া যাবে না। এর বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন করতে হবে।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকাও শুনেছেন স্থানীয়দের ছাঁটাইয়ের কথা। তিনি বলেন, এটা শুধু আজকে নয়, পান থেকে চুন খসলেই স্থানীয়দের চাকরি থাকে না। আর বহিরাগতরা অনায়াসেই থাকে। তিনি অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো স্থানীয় এনজিওর সঙ্গে চুক্তি করে কাজ করার নিয়ম থাকলেও সেটা মানছে না। তারা নিজেরা বাইরে থেকে এনজিও হাইয়ার করে এনে কাজ করে, এতে নানান ধরনের অনিয়ম হচ্ছে।

এ ব্যাপারে শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম বলেন, স্থানীয়দের বাদ দিয়ে রোহিঙ্গাদের চাকরি দেওয়ার কোন সুযোগ নাই। তবে হয়তো প্রজেক্ট শেষ হয়েছে, সে জন্য হয়তো স্থানীয় কারো চাকরি নিয়ে সমস্যা হতে পারে।

"