কুড়িগ্রামে খুরারোগে আক্রান্ত পশু বিক্রি হচ্ছে কসাইদের কাছে

প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আরিফুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম

কুড়িগ্রামে গবাদি পশুর মধ্যে খুরা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। জেলার রাজারহাট উপজেলার উমর মজিদ ও চাকিরপশার ইউনিয়নে গত দুই সপ্তাহে অন্তত অর্ধশতাধিক গরু ও ছাগল আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে খুরা রোগে আক্রান্ত ১৫টি গরুর মৃত্যু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট এলাকার পশু পালনকারী গৃহস্থদের সাথে কথা বলে জানা গেছে। আর খুরা আক্রান্ত পশুর মৃত্যুর আতঙ্কে অসুস্থ গরু কসাইদের কছে বিক্রি করছেন ভূক্তভোগীরা। এতে করে জনস্বাস্থ্য হুমকির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার অধিবাসীরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহের মধ্যে রাজারহাট উপজেলার উমর মজিদ ইউনিয়নের পান্থাপাড়া মৌজার বক্সিপাড়া গ্রামের আব্দুর রশিদ বক্সির তিনটি, নজীর হোসেনের একটি, একই মৌজার তেলিপাড়ার গোলাম রব্বানীর তিনটি, মাহবুবার রহমানের একটি, মাইদুল ইসলামের একটিসহ উমর মজিদ ও চাকিরপাশার ইউনিয়নে অন্তত ১৫টি গরু খুরা রোগে মারা গেছে। উমর মজিদ ইউনিয়নের পান্থাপাড়া মৌজার তেলিপাড়া গ্রামের জাহাঙ্গীর নামের এক দিনমজুর জানান, গত মঙ্গলবার (৪ ডিসেম্বর) তার তিনটি গরু খুরা রোগে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে একটি বকনা গরু খুরা রোগে আক্রান্ত হয়ে মুখ দিয়ে লালা ছাড়লে তিনি দ্রুত কসাই ডেকে সে গরু বিক্রি করে দেন। বাকি দুটো গরুর মধ্যে একটি বাছুর এবং একটি গর্ভবতী গাভী হওয়ায় সেগুলো কসাই নিতে রাজি হয়নি।

জাহাঙ্গীর বলেন,‘এক মাস আগে ভেকসিন নিলেও আমার গরুগুলো খুরা রোগ থেকে রেহাই পাইলো না। ডাক্তার কি ভেকসিন দিলো কে জানে! আমি গরিব মানুষ, আমার এই ক্ষতি কেমন করে পোষাবো!’

জাহাঙ্গীর আরও জানান, তার বাবার দুইটি গরু ও দুটি ছাগলসহ তার গ্রামে অন্তত ১৫/২০টি গরু ও ছাগল খুরা রোগে আক্রান্ত হয়েছে। গ্রামের অনেকে খুরা আতঙ্কে রয়েছে বলে জানান জাহাঙ্গীর।

এদিকে গত ৪ ডিসেম্বর উমর মজিদ ইউনিয়নের মৌলভী পাড়ায় এক ভ্যান চালকের দুটি গরু খুরা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে ওই ভ্যানচালকের নাম জানা যায়নি।

একই ইউনিয়নের মাইদুল ইসলাম নামে অপর এক দিনমজুর জানান, তার দুইটি গরু খুরা রোগে আক্রান্ত হলে একটি মারা যায়। খুরা রোগ আক্রান্ত অপর গরুটি তিনি ১২ হাজার টাকায় কসাইয়ের কাছে বিক্রি করে দেন।

মাইদুল জানান, তিনি যে গরুটি ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন সেটির বাজার মূল্য অন্তত ২৫/২৬ হাজার টাকা। কিন্তু খুরা রোগে আক্রান্ত হয়ে গরুর মুখ দিয়ে লালা আসায় তা বাজারে কেউ নিতে চায় না। বাধ্য হয়ে কসাই ডেকে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করেছেন তিনি। এদিকে এলাকায় খুরা রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকলেও তা প্রতিরোধে প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না বলে জানান ভূক্তভোগী এসব পশু পালনকারী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজারহাট উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে দুই শতাধিক দুগ্ধখামার, অর্ধ শতাধিক ছাগল ও ভেড়ার খামার রয়েছে। তবে কৃষি প্রধান এলাকা হওয়ায় এবং উপজেলায় পর্যাপ্ত চারণ ভূমি থাকায় উপজেলার প্রায় প্রতিটি বড়িতে ৫/৭টি করে গরু রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৩-৪ হাজার লিটার দুধ উৎপাদন হয় এ উপজেলায়। দুধ সংগ্রহের জন্য তিনটি চিলিং সেন্টারও রয়েছে এখানে।

রাজারহাট উপজেলার উমর মজিদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সরদার তার ইউনিয়নে গবাদি পশু খুরা রোগে আক্রান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ভূক্তভোগীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি নিজে জেলা ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করেও খুরা রোগ নিরাময় কিংবা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের কার্যকর কোনও উদ্যোগ দেখতে পাননি। এ অবস্থায় তার ইউনিয়নের খামারি ও সাধারণ গৃহস্থরা গবাদি পশু নিয়ে দুঃচিন্তায় পড়েছেন।

জনবল সংকট এবং ভূক্তভোগীদের সচেতনতার অভাবকে দায়ী করলেও উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে খুরা রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা স্বীকার করে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জোবায়দুল কবির বলেন, উপজেলার দুই একটি ইউনিয়নের কিছু জায়গায় গবাদি পশুর মধ্যে খুরা রোগের সংক্রমন দেখা দিয়েছে। তবে তা নিয়ন্ত্রনে রয়েছে।

খুরা রোগে গবাদি পশুর মৃত্যুর বিষয়ে এই প্রাণি চিকিৎসক বলেন, ‘খুরা রোগে সাধারণত পূর্ণ বয়স্ক গরু মৃত্যুর হার কম। দুই সপ্তাহ আগে এ রোগে কিছু বাছুরের মৃত্যু হয়েছে। আর গ্রামের লোকেরা আক্রান্ত পশুর নানা অপচিকিৎসা করার কারণে অনেক সময় পশুর মৃত্যু হতে পারে।’

সম্প্রতি আক্রান্ত পশুর মৃত্যু ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের অবহেলার বিষয়ে এই কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি পরিবারে যাওয়ার মত আমাদের পর্যাপ্ত জনবল নেই। তবে আমাদের পর্যাপ্ত ভেকসিন রয়েছে। ভূক্তভোগীরা আমাদের কাছে আসলে আমরা অবশ্যই সঠিক পরামর্শ ও আক্রান্ত পশুর চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কসাইদের কাছে খুরা রোগে আক্রান্ত পশু বিক্রির খবরে কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম জানান, ‘যে কোনও রোগাক্রান্ত পশুর মাংস জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি এবং সেগুলো কোনও ভাবেই বাজারে বিক্রি কিংবা খাওয়া উচিৎ নয়।’ এ সময় সংশ্লিষ্ট এলাকার বাজারগুলোতে বাজার পরিদর্শনের ব্যবস্থা নেওয়ারও আশ্বাস দেন এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

"