হুমকির মুখে প্রতিরক্ষা বাঁধ

কুমিল্লায় গোমতীতে মাটি কাটার ধুম

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

মারুফ আহমেদ, কুমিল্লা

কুমিল্লার প্রধান নদী গোমতী। এই নদীর চরে বছর জুড়েই চাষাবাদে ব্যস্ত সময় পার করে কৃষক। তবে শুষ্ক মৌসুম আসলেই মাটি খেকোদের অত্যাচারে চরাঞ্চলের প্রায় শতাধিকস্থান থেকে অবাধে মাটি কাটা শুরুর কারণে চাষীদের মাঝে হতাশা নেমে আসে। এ জন্য অনেকস্থানে চাষাবাদ করতে না পেরে ভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়ছেন অনেক কৃষক। এতে কমে যাচ্ছে গোমতীর চরে সবজি উৎপাদনের পরিমান। একইসাথে রাত-দিন অবাধে ডাম্প ট্রাক-ট্রাক্টরে মাটি পরিবহনের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ’ হচ্ছে প্রতিরক্ষা বাধঁ, বায়ূ দুষণে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে আশঙ্কাজনকভাবে।

সরেজমিন ঘুরে বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, কুমিল্লার প্রধান নদী গোমতী আদর্শ সদর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দেবীদ্বার, মুরাদনগর, তিতাস হয়ে দাউদকান্দিতে মেঘনায় মিলিত হয়। গোমতী প্রতিবছর বর্ষায় বিপুল পরিমান পলি এনে উর্বর করে চরাঞ্চল। আর সেই চরাঞ্চলে ব্যস্ত সময় পার করে নদী তীরের হাজার হাজার কৃষক। কিন্তু শুষ্ক মৌসুম শুরু হলেই আতঙ্কিত হয়ে উঠে অনেক কৃষক। কারণ এ সময় ভূমি খেকোরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীকে ম্যানেজ করে নদীর চর এলাকায় অবাধে মাটি কাটা শুরু করে। নিরিহ কৃষকরা প্রতিবাদ করলে হামলা-মামলার শিকার হওয়ায় প্রতিবাদের ভাষাও হারিয়ে গেছে। আর এভাবে দিন দিন কমে যাচ্ছে গোমতীর পাড়ে কৃষকের চাষাবাদ।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, পুরো বছরই গোমতী নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ড্রেজারে বালু উত্তোলন করে একাধিক সিন্ডিকেট। তবে শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে বালু উত্তোলনের পরিমাণ কিছুটা কমলেও গোমতী তীরের আদর্শ সদর উপজেলার টিক্কাচর, ছত্রখীল, পালপাড়া, দুর্গাপুর, আমতলী, কাচিয়াতলী, বুড়িচং এর বাবুবাজার, বাজেবাহেরচর, পূর্বহুরা ব্রাহ্মণপাড়ার রামনগর, নাল্লা খেয়া ঘাট, দেবীদ্বারের সাইচাপাড়া, কালিকাপুর, মুরাদনগরের কোম্পানীগঞ্জ, নবীয়াবাদ, সিএন্ডবি, তিতাস স্লইসগেট, আসমানিয়াবাজার, দাউদকান্দির বিভিন্ন স্থান থেকে শ্রমিক দিয়ে দিনে-রাতে সমানে মাটি কাটছে প্রভাবশালীরা। সেই মাটি ডাম্প ট্রাক, ট্রাক্টরে সড়ক-মহাসড়ক দিয়ে জেলার বিভিন্ন স্থানের আবাসন প্রকল্প, নীচু ভূমি বা জলাশয় ভরাট ছাড়াও ইটভাটায় নিয়ে যাচ্ছে। এতে সড়ক বা মহাসড়কের বিভিন্নস্থানে মাটির প্রলেপ জমে বদলে যায় রাস্তার চিত্র। অবাধে মাটি কাটায় কৃষকরা স্বাভাবিকভাবে ফসল উৎপাদন করতে পারেনা।

কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উন্নয়ন কর্মকর্তা সফিকুল আলম জানান, গোমতীর চরাঞ্চল কুমিল্লার সবজি ভান্ডার। এখানে জেলার মোট চাহিদার প্রায় ১৭-১৮ শতাংশ ফসল উৎপাদন হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানান, অবাধে মাটি কাটায় দিন দিন চরের বিস্তির্ন এলাকায় শত শত একর জমিতে চাষাবাদ থেকে বিরত হচ্ছে অসংখ্য কৃষক। ফলে কমছে চরে উৎপাদিত ফসলের পরিমানও। সদর উপজেলার আমতলী, কাচিয়াতলী, বুড়িচংয়ের কাঠালিয়া, পূর্বহুরা এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষক জানান, আগে এখানে বছরের বারো মাসই চাষাবাদ হতো। এখন মাটি খেকোদের দাপটে চাষাবাদের জমি কমে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রতিবাদ করলেও কোন লাভ নেই।

এদিকে গোমতীর চর থেকে মাটি কেটে খোলা ট্রাক, ট্রাক্টরে পরিবহন করায় নদী তীরের মানুষদেরও দুর্ভোগ বাড়ছে। ধূলোবালি উড়ায় বিপন্ন হচ্ছে নদী তীরের পরিবেশ, বাসা-বাড়ির লোকজন আক্রান্ত হচ্ছে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে, ট্রাক-ট্রাক্টরের আওয়াজে নির্ঘুম রাত কাটে মানুষের। অতিরিক্ত ওজনের ডাম্প ট্রাকে মাটি বহন করায় ভেঙ্গে পড়েছে প্রতিরক্ষা বাঁধের বহু স্থান। বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙ্গনের চিন্তায় চরম আতঙ্কে থাকতে হয় নদী তীরের মানুষদের। মাটি কাটা সিন্ডিকেট লাখ লাখ ঘনফুট মাটি বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা আয় করলেও উপোষ থাকতে হয় কৃষকদের। আর সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে প্রতিবছর সংস্কার বা মেরামত করছে প্রতিরক্ষা বাধঁ।

অবাধে মাটি কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড কুমিল্লার প্রধান প্রকৌশলী বাবুল চন্দ্র শীল বলেন, নদী সম্পদ রক্ষা, রাজস্ব আদায়, নিয়ন্ত্রণ, বালু উত্তোলন সব জেলা প্রশাসনের এখতিয়ারে। আমাদের কাজ শুধু সরকারী বরাদ্দ আসলে ক্ষতিগ্রস্থ বাধঁ মেরামত করা। এর বাইরে আমাদের আর কোন কাজ নেই।

 

"