মেহেরপুরে বাম্পার ফলনেও হতাশ সবজি চাষিরা

প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

দিলরুবা খাতুন, মেহেরপুর

বাম্পার ফলনেও হতাশ হয়ে পড়েছে মেহেরপুরের সবজি চাষীরা। উৎপাদন খরচের অর্ধেকও ফিরে পাচ্ছেন না সবজি চাষীরা। অনেকে জমি থেকে সবজি সংগ্রহ বন্ধ করে দিয়েছেন। উৎপাদন খরচ ফিরে পেতে পাইকারী দরে বিক্রি না করে অনেকেই ফেরি করে বিক্রি করছেন সবজী। জানা গেছে, মেহেরপুরে চলতি মৌসুমে সবজির উৎপাদন বেড়েছে। এবার ১৯ হাজার ২০০ বিঘা জমিতে চাষ হয়েছে ফুলকপি আর পাতাকপি। মরিচ চাষ হয়েছে ৩৮ হাজার ৭৫৫ বিঘা জমিতে। শীম চাষ হয়েছে ৩০০ বিঘা জমিতে। পেঁপে চাষ হয়েছে প্রায় ৫০০ বিঘা জমিতে। স্থানীয় বাজারগুলোয় চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত সরবরাহ থাকায় কমে গেছে শীতকালীন শাক-সবজির দাম। ফলে উৎপাদিত সবজির দাম কম পাওয়ায় হতাশ এ অঞ্চলের চাষীরা। ভালো দামে বিক্রি করতে না পেরে হতাশ বিক্রেতারাও।

গতকাল মঙ্গলবার উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মেহেরপুরের বাজারে কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা কেজি দরে। পাতা কপি, ফুল কপি বিক্রি হচ্ছে ৫ টাকা কেজি করে। পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ৩ টাকা কেজি দরে। মাস দুই আগেও এর চেয়ে তিন থেকে চারগুণ বেশী দামে বিক্রি হয়েছে এসব সবজী। বর্তমানে প্রতিদিন মেহেরপুর থেকে অন্তত ৫০ থেকে ৫৫ ট্রাক সবজি দেশের বিভিন্ন জেলায় বাজারজাত হচ্ছে। জমি থেকেও সবজি ট্রাক ভরে নিয়ে যাচ্ছে ফড়িয়া সবজি ব্যবসায়ীরা।

মেহেরপুর কৃষি নির্ভর জেলা। মেহেরপুর জেলার মানুষ অর্থনৈতিকভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এক সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সবজি আনা হতো এ অঞ্চলে। কিন্তু ধীরে ধীরে মেহেরপুর থেকে এখন প্রতিদিন গড়ে ৫০ ট্রাক সবজি দেশের বিভিন্ন জেলায় বাজারজাত হচ্ছে। শীতকালীন শাকসবজির মধ্যে বাঁধাকপি, টমেটো, লাউ, মটরশুঁটি, ফুলকপি, শিম, মুলা, গাজর, বেগুন, পালংশাক, লালশাক, বরবটি, শালগম উল্লেখযোগ্য। জেলার অধিকাংশ প্রান্তিক চাষীদের আয়ের প্রধান উৎস সবজি চাষ।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, দাম না পাওয়ায় চাষীদের মাঝে চরম হতাশা নেমে এসেছে। সবজি চাষীরা বলছেন, সবজির দাম গত বছরের তুলনায় এ বছর অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।

কাঁচা বাজারের পাইকারি সবজি ব্যবসায়ী শাহিনুর রহমান জানান, তিনি প্রায় ১০০ চাষীর মাঝে সবজি চাষে পুঁজি খাটিয়েছেন। তারা সবজি বিক্রি করেই টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু সবজির দাম না থাকায় এবার টাকা দাবি করতে পারছেন না। তিনি আরও বলেছেন এবার বাম্পার ফলনেও চাষীরা উৎপাদন খরচ ফিরে পাচ্ছে না।

মরিচ চাষী ঝাউবাড়িয়া গ্রামের হাসমত আলী জানান, দুইবিঘা জমিতে মরিচ চাষ করেছেন। শ্রমিক দিয়ে জমি থেকে মরিচ তুলতে প্রতি কেজিতে খরচ দিতে হয় ৭ টাকা। বাজারজাতে পরিবহন খরচ দিতে হয় কেজিতে এক টাকা। আড়ৎদারিসহ অন্যান্য খরচ ২ টাকা মিলে কেজিতে ১০ টাকা খরচ হয়। অথচ বাজারে মরিচ বিক্রি করতে হচ্ছে ১০ থেকে ১২ টাকা কেজি দরে। পাতাকপি ফুলকপিও বিক্রি করতে হচ্ছে ৪ থেকে ৫ টাকা কেজি দরে। একমাত্র শীম বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা কেজি দরে।

চাষিদের অভিযোগ, দিন-রাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে শবজি ফলিয়ে খরচের অর্ধেক টাকাও তুলতে পারছেন না তাঁরা। সবজি চাষি আমির হোসেন জানান, তিনি এ বছর ২৪ শতক জমিতে লাউয়ের আবাদ করেছেন। প্রথম দিকে প্রতিটি লাউ বিক্রি করেছেন ১২ থেকে ১৫ টাকা করে। এখন বিক্রি করছেন ৫ টাকা দরে। এ দামে লাউ বিক্রি করে কোনো রকমে আবাদের খরচ উঠেছে বলে জানান তিনি।

ঢাকার কাওরান বাজারের সবজি ব্যবসায়ী আফসার মিয়া বলেন, চাষির কাছ থেকে যে দামে সবজি কেনা হয়, তার উপর খাজনা, লেবার খরচ, আড়তদারি ও পরিবহন খরচ দিয়ে ঢাকায় মাল পৌঁছাতে সবজির মূল্য দ্বিগুণেরও বেশি পড়ে যায়। এখানে একটি লাউ ৫ টাকায় কিনলে, ঢাকার বাজারে আবার আড়তদারি দিয়ে তা ২০-২৫ টাকায় বিক্রি না করলে লাভ হয় না।

মেহেরপুর জেলা খামার বাড়ির উপ-পরিচালক ড. মো. আক্তারুজ্জামান জানান, সারাদেশে ব্যাপক চাষ ও বাম্পার ফলনের কারণেই দাম কমেছে। তবে সপ্তাহকাল পরেই বিভিন্ন সবজীর দাম বাড়বে বলে তিনি জানান।

 

"