মেহেরপুরে কীটনাশকের অবাধ বিক্রি হুমকির মুখে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য

প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

দিলরুবা খাতুন, মেহেরপুর

মেহেরপুরের প্রতিটি গ্রামের রাস্তার পাশে এবং মাঠের মাঝে কীটনাশকের খালি প্যাকেট ও বোতল ফেলার নির্ধারিত স্থান রয়েছে। কিন্তু কোনো কৃষকই এসব স্থানে খালি বোতল ও প্যাকেট ফেলছেন না। যেকোন আবাদেই ব্যাপক কীটনাশক ব্যবহারের কারণেই কোম্পানিগুলো কীটনাশকের খালি প্যাকেট ও বোতল ফেলার স্থায়ী জায়গা করেছেন। যাতে প্যাকেটের অবশিষ্টাংশ কোনো অনাকাঙ্খিত ঘটনা না ঘটে। প্রতি মাসে একবার করে এসব স্থানে ফেলা বোতল প্যাকেট পুড়িয়ে ফেলার নিয়ম রয়েছে।

‘বোকার ফসল পোকায় খায়’ এমন চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে অবাধে বিক্রি হচ্ছে বালাইনাশক বা কীটনাশক। বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ভারতীয় কীটনাশকও প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। বালাইনাশক এক ধরনের ভয়ংকর বিষ। ফসলে ক্ষতিকর পোকা-মাকড়, অবাঞ্ছিত উদ্ভিদ, ছত্রাক ধ্বংস করতে নির্বিচারে ব্যবহার হচ্ছে এ বিষাক্ত বালাইনাশক। জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বালাইনাশক বন্ধের দাবীতে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা লাগাম টানার দাবী জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, কীটনাশক বিক্রি ও ব্যবহারে নেই কোনো তদারকি। ক্ষতিকর বালাইনাশকের লাগাম টানতে না পারলে ঝুঁকি কমবে না জনস্বাস্থ্যের। কীটনাশক ব্যবহারকারী কৃষকদেরও নেই কীটনাশক ব্যবহারের প্রশিক্ষণ। গ্রাম গঞ্জের মুদি দোকানেও কীটনাশক বিক্রি হচ্ছে। এসব কীটনাশক বিক্রেতারাই বিষ বিশেষজ্ঞর মতো কোন ফসলে কী পরিমান কীটনাশক প্রয়োগ, কীটনাশকের গুণাগুণ গড় গড় করে কৃষকদের বলে যান। কৃষকরাও না বুঝে তাদের কথায় মুগ্ধ হয়ে কীটনাশক ব্যবহার করছেন। বছরে অন্তত কয়েক কোটি টাকার নিষিদ্ধ ভারতীয় কীটনাশক বিক্রি হচ্ছে। মারাত্মক ক্ষতিকর যে কীটনাশক দেড় দশকেরও বেশি আগে নিষিদ্ধ করা হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসেবে কীটনাশক বিক্রির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৯৩২টি। এর মধ্যে খুচরা বিক্রেতা ৯৫৬ জন। এসব বিক্রেতাদের প্রকলেন, সানটাপ, পুরাটাপ, সায়পারম্যাথিন নামের কীটনাশকগুলো বিক্রির জন্য কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ অনুমতি দিয়েছে। এসব কীটনাশক নির্দিষ্ট মাত্রায় সবজি ও ফসলে দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। সবজিতে কীটনাশক প্রয়োগের ২১ দিন পর্যন্ত এর কার্যক্ষমতা থাকে। অথচ কীটনাশক ব্যবহারের পরদিনই কৃষকরা জমি থেকে তুলে বাজারে বিক্রি করে আসছেন। সদর উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের মোজাম্মেল হক ও ঝাউবাড়িয়া গ্রামের হান্নান আলী জানিয়েছেন- তারা ধানিজমিতে থায়োডিন প্রয়োগ করায় তাঁর জমিসহ আশপাশের জমির দেশি প্রজাতির বিভিন্ন মাছ, সাপ, ব্যাঙ, পোকামাকড়সহ সব ধরনের জলজ প্রাণী মরে-পচে দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে। এই বিষ প্রয়োগের কারণে মাটি, পানি ও বায়ু বিষাক্ত-দূষিত হয়ে পড়ে। ভারতে মূলত এসব উচ্চমাত্রার বিষ বিভিন্ন বিষাক্ত সাপ, সরীসৃপ, জোঁক ও পিঁপড়া নিধন করতে ব্যবহার হয়। জেলার কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বর্তমানে ধান, সবজি ও কলায় বিভিন্ন ধরনের নিত্যনতুন পোকা আর রোগব্যাধির আক্রমণ দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় বাজারে প্রচলিত ওষুধ দিয়ে এসব পোকা দমন সম্ভব হচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে ভারতীয় ওষুধ প্রয়োগ করছেন তাঁরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কৃষি বিশেষজ্ঞ জানান, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ কীটনাশক ‘ডাইমেক্রন’- ভারতে জঙ্গল ও ড্রেন পরিষ্কার করার কাজে ব্যবহৃত হয়। অথচ আমাদের এখানে আম, কলা, পেঁপে ইত্যাদি ফলে ব্যাপক প্রয়োগ হচ্ছে। এতে এসব ফলের হলুদ রং ধারণ করলেও এই বিষাক্ত কলা খেয়ে অনেকে আক্রান্ত হচ্ছে জটিল রোগে।

গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার সজিব উদ্দীন জানিয়েছেন, বিষয়টি কৃষি বিভাগের দেখভাল করার কথা। কিন্তু তাদের তদারকির অভাব ও মানুষের অসচেতনতার কারণে ক্ষতিকর কীটনাশক অবাধে ব্যবহার হচ্ছে। এটি বন্ধ না হলে দুর ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দেবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. মো. আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, বালাইনাশকের ব্যবহার নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষক এখনও কীট, মাকড় ও ছত্রাকনাশক হিসেবে বিষাক্ত বালাইনাশক আশঙ্কাজনক হারে ব্যবহার করছেন। মাঠপর্যায়ে এই রাসায়নিক ওষুধ ব্যবহারের তদারকি বেশ দুর্বল। বিক্রয়কারী কোম্পানি ডিলারদের মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে এগুলো অবাধে বিক্রি হচ্ছে বলেও তিনি স্বীকার করে আরও বলেন, এখনই এর লাগাম টানার দরকার। নাহলে দুরভবিষ্যতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাবে। গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার সজিব উদ্দীন জানিয়েছেন, বিষয়টি কৃষি বিভাগের দেখভাল করার কথা। কিন্তু তাদের তদারকির অভাব ও মানুষের অসচেতনতার কারণে ক্ষতিকর কীটনাশক অবাধে ব্যবহার হচ্ছে। এটি বন্ধ না হলে দুর ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দেবে।

"