পাট সংকটে বাংলাদেশ জুট মিল

প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আল-আমিন মিয়া, পলাশ (নরসিংদী)

বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) নিয়ন্ত্রণাধীন পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল শিল্প এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ জুট মিলে পাট সংকট দেখা দিয়েছে। মিলে পাট না থাকায় দৈনিক উৎপাদন ৪২ টন থেকে ১০ টনে নেমে এসেছে। এ ছাড়া ছয় সপ্তাহ ধরে বন্ধ রয়েছে শ্রমিকদের মজুরি। এতে মিলের প্রায় সাড়ে তিন হাজার শ্রমিকÑকর্মচারী ও কর্মকর্তার মাঝে মিল বন্ধের আতঙ্ক বিরাজ করছে।

জানা গেছে, মিলের উৎপাদিত প্রায় ৪০ কোটি টাকা মূল্যের অবিক্রীত পাটজাত পণ্য মজুদ রয়েছে মিলের গুদাম ঘরে। স্থান সংকোলান না থাকায় উৎপাদিত ফিনিশিং বিভাগে যত্রতত্র পড়ে এসব পাটজাত পণ্য নষ্ট হচ্ছে। পণ্য বিক্রি না হওয়ায় অর্থ সংকটে পড়তে হচ্ছে মিল কর্তৃপক্ষকে। বাংলাদেশ জুট মিলের পণ্য বিক্রি করে থাকে বিজেএমসি। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি বাবদ বিজেএমসির কাছে ৭৩ কোটি টাকা পায় বাংলাদেশ জুট মিল। কিন্তু বিজেএমসি সময়মত টাকা না দেওয়ার কারণে শ্রমিকদের বেতন ভাতাদি দিতে পারছেনা মিল কর্তৃপক্ষ। এদিকে, বেতন-ভাতাদি না পেয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করতে হচ্ছে মিলের সাড়ে তিন হাজার শ্রমিক কর্মচারীদের।

মিলের শ্রমিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তারা সপ্তাহে মাত্র এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকা মজুরি পান। কিন্তু একাধিক সপ্তাহের মজুরি বকেয়া থাকায় তাদের আর্থিক কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। অনেকে মজুরি না পেয়ে মিলে আসছেন না।

শ্রমিকরা আরও বলেন, একাধিক সপ্তাহ ধরে মজুরি না দেওয়ার কারণে কোনো দোকানদার আমাদের বাকী সদাই দিচ্ছে না। ফলে খেয়ে না খেয়ে অতি কষ্টে পরিবার-পরিজন নিয়ে দিন কাটাচ্ছি।

মিলের সিবিএ সভাপতি ইউসুফ আলী ও সাধারণ সম্পাদক আক্তারুজ্জামান প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, ৫২০ তাঁতের এই জুট মিলটিতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কর্মরত আছেন। পাট না থাকায় ৫২০ তাতের মধ্যে চালু আছে মাত্র ১০০ তাত। এক সময় বাংলাদেশ জুট মিলটি দেশের অন্যতম লাভজনক জুট মিল ছিল। কিন্তু বিজেএমসি কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা ও উদাসীনতার কারণে মিলটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। বিজেএমসি টাকা না দেওয়ায় মিল কর্তৃপক্ষ চলতি সপ্তাহসহ ছয় সপ্তাহ যাবত শ্রমিকদের মজুরি ও চলতি মাসসহ দুই মাস ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতাদি দিতে পারছেন না।

তারা আরো বলেন, অপরদিকে মিলের বিদ্যুৎ বিল প্রায় পোনে ২ কোটি টাকা ও গ্যাস বিল ৬০ লাখ টাকা বকেয়া জমে গেছে। বকেয়া পরিশোধ না করার কারণে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বারবার বিদ্যুৎ সংযোগ বিছিন্ন করার নোটিশ দিচ্ছে। ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গত ৬ বছর যাবত মিলের চাকরিচ্যুত শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচ্যুইটির টাকাও দিতে পারছেন না মিল কর্তৃপক্ষ। এ পর্যন্ত মিলে প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচ্যুইটির প্রায় ১৮ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ জুট মিলের কাছে পাট ব্যবসায়ীরা ৩২ কোটি টাকা পাওনা থাকায় এখন মিলে পাটও সরবরাহ করছে না পাট ব্যবসায়ীরা। পাট না থাকায় যে কোনো সময় মিলের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে বলে জানান মিলের সিবিএ নেতারা।

মিলের তাত বিভাগের শ্রমিক জাহাঙ্গীর, কবির হোসেন, মিলের প্রবীন শ্রমিক সিরাজ মোল্লা, ফিনিশিং বিভাগের রাশেদ মিয়া প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, বাজারের সব কিছুর দাম বৃদ্ধির মধ্যে ছয় সপ্তাহ ধরে আমাদের মজুরি বন্ধ। এমতাবস্থায় আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে অতি কষ্টে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছি। তারপরেও আমরা মিলের উৎপাদন অব্যাহত রেখেছি। এদিকে মিলটির উৎপাদন বিভাগ থেকে জানা গেছে, মিলের উৎপাদিত প্রায় ৪০ কোটি টাকার পাটজাত পণ্য মজুদ রয়েছে। এসব পণ্য সময়মতো বিক্রি করতে না পারায় আর্থিক সংকটে পড়েছে মিল কর্তৃপক্ষ। আর এ কারণে শ্রমিকদের মজুরি প্রদানে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। ফলে বকেয়া মজুরির পরিমাণ বাড়ছে। নিয়মিত মজুরি প্রদান করতে না পারায় দেখা দিচ্ছে শ্রমিক অসন্তোষ। তাছাড়া বিজেএমসি পাট কেনার টাকা না দেওয়ার কারণে উৎপাদন চালু রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এসব বিষয়ে বাংলাদেশ জুটমিলের মহাব্যবস্থাপক মো. গোলাম রব্বানীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

 

"