শতফুট চওড়া পুরনো খালটি এখন সরু নালা

দূষণ ও দখলে হারিয়ে যাচ্ছে এর অস্তিত্ব

প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আবদুল আলীম, নারায়ণগঞ্জ

ব্রিটিশ শাসন আমলে রূপগঞ্জে প্রায় ২৪টি খাল ছিল বলে জানাচ্ছেন স্থানীয়রা। কিন্তু এর বেশির ভাগেরই এখন কোনো চিহ্ন নেই। উপজেলা কার্যালয়ের তথ্য মতে, রূপগঞ্জে খালের সংখ্যা ছয়টি। কিন্তু এর মধ্যে টাটকী খালের নামই নেই। তবে তারাবো পৌরসভা কার্যালয়ে খালটি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।

‘ছোটকালে দেখছি, এই খাল দিয়া পাটের নাও (নৌকা) চলত। হেই খালডা ভইরা ফালাইল দখলদাররা।’ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার টাটকী-গোলাকান্দাইল খালের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলছিলেন হাটিপাড়া গ্রামের তাহের মিয়া। উপজেলার তারাবো পৌর এলাকার ২০০ বছরের পুরনো ১১৫ ফুট প্রস্থের খালটি এখন চিকন নালায় পরিণত হয়েছে। দূষণ আর দখলে হারিয়ে যাচ্ছে এর অস্তিত্ব।

স্থানীয় লোকজন প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, রূপগঞ্জের মধ্যে টাটকী-গোলাকান্দাইল খাল সবচেয়ে দীর্ঘ ও পুরনো। শীতলক্ষ্যার সঙ্গে সংযোগ পেয়ে টাটকী-যাত্রামুড়া হয়ে খালটি গোলাকান্দাইল-বালিয়াপাড়া পর্যন্ত পৌঁছে। খালটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩ কিলোমিটার। এ খালের পানি নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী অগ্রণী সেচ প্রকল্পের প্রায় এক হাজার হেক্টর জমিতে ব্যবহার করা হয়। খাল দিয়ে একসময় ব্যাপারীরা পাট বোঝাই বড় নৌকা চালাতেন। স্থানীয় জেলেরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সর্বশেষ ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের খাল প্রকল্পে আওতায় খনন করাও হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে দখলের কবলে পড়ে টাটকী খাল। অবৈধভাবে এর ওপর পাকা ভবন, মার্কেট শিল্প কারখানা নির্মাণ করা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খালের প্রবেশমুখ শীতলক্ষ্যার সংযোগ অংশ থেকেই দখল শুরু হয়েছে। বাঁশ, টিন দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে দোকানপাট। গড়ে তোলা হয়েছে পাকা বাড়ি, মার্কেট, শিল্প কারখানা। টাটকী থেকে শুরু করে গোলাকান্দাইল-বালিয়াপাড়া পর্যন্ত খালটির পুরো অংশ জুড়েই অবৈধ দখলদারদের আগ্রাসন। খালটির টাটকী অংশ দখল করে স্থানীয় মোজাম্মেল হক মোজা ও লিলি বেগম বাড়ি নির্মাণ করেছেন। যাত্রামুড়া ব্রিজের কাছে দখল করে তৈরি করা হয়েছে স্টিল মিল। দখলদারদের তালিকায় রয়েছে ডগকিং কারখানা, হাজি কলোনি, নওয়াব আলীর বাড়ি। গোলাকান্দাইল থেকে রাব্বির বাড়ি পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার গড়ে তোলা হয়েছে দোকানপাট, মার্কেট ও বাড়ি। দখলদারদের বেশির ভাগই প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী অথবা সমর্থক। আফজাল মিয়া, মনু বাবু, মন্টু চন্দ্র ও মতিলাল বাবু খালের জায়গায় অবৈধভাবে দোকানপাট গড়ে তুলেছেন। প্রভাবশালী জব্বার মিয়া ও সোনা মিয়া গড়ে তুলেছেন দোকানপাট।

অবৈধ দখল সম্পর্কে মনু মিয়া জানান, তিনি ওই জায়গায় মাসে ৮০০ টাকা করে ভাড়া নিয়েছেন হোসেন মিয়ার কাছ থেকে। মিলন মিয়া বলেন, ৮-১০ জন যেভাবে দখল করেছে আমিও সেভাবেই দখল করেছি। কাউকে কোনো কিছু দিতে হয় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দিতে হবে কেন? খাল তো কারো নিজস্ব সম্পত্তি না। সোহেল মিয়ার খালের ওপর চারটি দোকান রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের পজিশন আছে তাই তুলেছি।

গোকান্দাইল অংশে ইটখোলার মালিক আবদুল আজিজ তার প্রস্তাবিত মার্কেটে যাতায়াতের জন্য খাল দখল করে রাস্তা নির্মাণ করেছেন। কয়েকজন দখলদার বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই এসব স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে।

পাউবো সূত্রে জানা যায়, টাটকী-গোলাকান্দাইল খাল দখল করে আটটি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

তারাবো পৌরসভা অফিস সূত্রে জানা যায়, টাটকীর খালের তারাবো অংশ পর্যন্ত দৈর্ঘ্য প্রায় আড়াই কিলোমিটার। আগে এর প্রস্থ ছিল ১১৫ ফুট। দখলের কারণে এখন প্রস্থ ৪০ থেকে ৫০ ফুট হয়েছে। পৌরসভা অংশের আড়াই কিলোমিটারের মধ্যে দুই কিলোমিটারই অবৈধ দখলদারদের হাতে চলে গেছে।

বর্জ্য ও দূষণে খালের পানি ব্যবহার অনুপযোগী। শিল্প কারখানার বর্জ্যে খালে দূষিত পানির প্রবাহ বইছে। দূষিত পানির দুর্গন্ধে টাটকী, তারাবো, যাত্রামুড়া, দীঘিবরাবো, বরপা, গোলাকান্দাইল, পুবেরগাও, গুতুলিয়া, চারিতাল্পকসহ ২৭টি গ্রামের বাসিন্দা দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।

দীঘলিয়া এলাকার কৃষক সোবাহান মিয়া বলেন, ‘এই খালের পানি যহন ভালা আছিল, তহন মাইনসে খাইত।’ পুবেরগাঁও এলাকার সবুর মিয়া বলেন, শিল্প কারখানার রাসায়নিক মিশ্রিত বর্জ্যরে পানি কৃষি কাজে ব্যবহারের কারণে জমিতে আগের মতো ফসল হয় না। আগে বিঘাপ্রতি ৪০ মণ ধান পাইতাম। অহন বিঘাতে ২০ মণ অয়।

খালে দূষিত পানি ফেলার বিষয়ে নিউ ঢাকা জুট মিলের নির্বাহী পরিচালক হুমায়ুন কবির বলেন, নিউ ঢাকার কোনো দূষিত পানি নেই।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুরাদুল হাসান বলেন, ধানের ফলন কম তো হবেই। পচা পানির কারণে গোড়া পচা রোগ হয়। পচা পানিতে সিসা জাতীয় পদার্থ থাকে। এসব সিসা ধানে চলে যায়। এসব ধান খেয়ে মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়।

তারাবো পৌরসভার মেয়র হাসিনা গাজী বলেন, পুরো খালটাই শিল্প মালিক ও প্রভাবশালীরা গিলে ফেলেছে। স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় খালটিকে পুনরুদ্ধার করা জরুরি হয়ে পড়েছে। শিগগিরই আমরা ব্যবস্থা নিব।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা (ইউএনও) আবু ফাতেহ মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, খাল দখলের বিষয়টি আমি শুনেছি। লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদফতরের পরিদর্শক মাইনুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি জানা আছে শিগগিরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন কবর সে মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

"