নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল

লোকবলের অভাবে বিঘ্নিত স্বাস্থ্যসেবা

প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আব্দুল আলীম, নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জের খানপুরে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অন্যতম চিকিৎসা কেন্দ্র। এ হাসপাতালে রোগীদের ভীর বরাবরই লক্ষণীয়। প্রতিদিন হাসপাতালে প্রবেশ করলেই দেখা যায় অসংখ্য রোগীর ভীড়। নারায়ণগঞ্জ ও আশে পাশের এলাকার লোকজন কম খরচে চিকিৎসা পাওয়ার জন্য এখানে ছুটে আসেন। কিন্তু টিকিট কিনতেই রোগীদের লাইনে দাঁড়িয়ে পার করতে হচ্ছে ঘন্টার পর ঘন্টা। টিকিট কিনেও ভোগান্তির শেষ হচেছ না তাদের। ডাক্তারের চেম্বারের সামনেও দাড়াতে হচ্ছে লম্বা সিরিয়ালে।

হাসপাতালটিতে রয়েছে জনবল সংকট। যে কারনে রোগীদের পোহাতে হচ্ছে এমন দুর্ভোগ। রোগীরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসলেও প্রচন্ড ভিড়ে আর ভ্যাপসা গরমে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন তারা। এত কষ্ট করে টিকিট নিলেও কখনো কখনো ডাক্তারের চেম্বারের সামনে লম্বা সিরিয়ালের কারনে চিকিৎসা নিতে পারছেন না অনেক রোগী। তাই বাধ্য হয়ে অনেকে বাইরের ক্লিনিকগুলোতে বাড়তি টাকা দিয়ে নিচ্ছেন প্রাইভেট চিকিৎসকের চিকিৎসা।

হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে ৯শ থেকে ১১শ রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। কিন্তু সেই তুলনায় নেই পর্যাপ্ত জনবল। এত লোকের কাছে টিকিট বিক্রির জন্য কাউন্টারে রয়েছে মাত্র ৩জন। যে কারনে টিকিট বিক্রি করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। ফলে টিকিট কাউন্টারের সামনে বাধছে লম্বা সিরিয়াল। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনেকে করছে টিকেট কালোবাজারি। রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালের কাউন্টারে সকাল ৮টায় উপস্থিত থাকার নিয়ম থাকলেও প্রতিদিন তিনজন কর্মকর্তাই আসেন ৯টা বাজে বা আরো পরে। কাউন্টারের সামনে রোগীদের দীর্ঘ লাইন বাধার অন্যতম কারন হচ্ছে সময়মত টিকিট কাউন্টার না খোলা।

এ সময় আরো জানা যায়, কাউন্টারের কর্মকর্তাদের যোগসাজসেই চলে টিকিট কালোবাজারি। দালালদের সাথে আগে থেকে করা চুক্তি অনুযায়ী টাকার বিনিময়ে দালালরা যখনি কাউন্টারে যায় সবার আগে তাদের টিকিট দেওয়া হয়। এতে সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি চরমে পৌছে যায়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৬ সালে জাপান সরকারের সহায়তায় নির্মাণ করা হয় খানপুর হাসপাতাল। তখন হাসপাতালটি ছিল ২০০ শয্যা বিশিষ্ট এবং এর জনবল ছিল ৩৯৪ জন। পরবর্তিতে হাসপাতালটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এপর ২০১৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর হাসপাতালটি ৩০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এখন হাসপাতালটিকে ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরনের কাজ চলছে। সেই সাথে হুহু করে বেড়েছে শহরের জনসংখ্যা ও চিকিৎসা প্রত্যাশী। কিন্তু হাসপাতালের বেড সংখ্যা বাড়লেও এখনো বাড়ানো হয়নি জনবল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জানা যায়, হাসপাতালটির মোট কর্মকর্তা কর্মচারীর ৩৯৪ জনের মধ্যে রয়েছে ৩২০ জন। ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য কর্মচারীসহ পদ শূন্য রয়েছে ৭৫টি। হাসপাতালটিতে এখন ৫০ জন চিকিৎসক রয়েছেন। নার্স রয়েছে ১৫২ জন। হাসপাতালটিতে পদ শূন্য রয়েছে সিনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি), সিনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু), সিনিয়র কনসালটেন্ট (এনেসথেশিয়া), সিনিয়র কনসালটেন্ট (প্যাথলজি), সিনিয়র কনসালটেন্ট (চর্ম বিভগ)। এছাড়া তৃতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা রয়েছে ৬০ জনের মধ্যে ৫১ জন। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রয়েছে ১৩৯ জনের মধ্যে ১০২ জন। জনবলের এই পরিসংখ্যান ২০০ শয্যা হাসপাতাল থাকা অবস্থায়। এখন এটি ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হচ্ছে। কিন্তু লোকবল ২০০ শয্যার পরিসংখ্যান অনুযায়ি যা প্রয়োজন তার থেকেও কম।

এছাড়া রয়েছে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের লোকবল সংকট। মাত্র ২ জন মেডিকেল অফিসারের মাধ্যমে ২৪ ঘন্টা দেওয়া হচ্ছে চিকিৎসা সেবা। যা নারায়ণগঞ্জের বর্তমান জনসংখ্যার তুলানায় খুব কম। তথ্যমতে, হাসপাতালের একেকজন ডাক্তার সকাল ৮ টা থেকে দুপুর ১ টা পর্যন্ত ৫ ঘন্টায় গড়ে ২০-২২ জন রোগী দেখেন। প্রতি ঘন্টায় যা দাঁড়ায় প্রায় ৪ জন। অর্থ্যাৎ প্রতিটি রোগী দেখার জন্য ডাক্তার সময় পায় মাত্র ১৫ মিনিট। ডাক্তারের চা, নাস্তা খাওয়া কিংবা টয়লেটে যাওয়ার সময় হিসাব করলে এ সময় আরো কম। এমন অবস্থায় চরম ভোগান্তিতে পরতে হচ্ছে রোগী, ডাক্তার উভয়কেই।

এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের সহকারী সোহেল রানা বলেন, ২০০ শয্যার লোকবল যা থাকর কথা তার থেকেও কম লোকবল নিয়ে হাসপাতাল পরিচালনা করা হচ্ছে। বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগ দুই জায়গাতেই এক অবস্থা। প্রথম অবস্থায় যে লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল তাদের অনেক মারা গেছে। আবার অনেকে অবসর গ্রহণ করেছে। আমরা চাইলেই সরকারি হাসপাতালে কাউকে নিয়োগ দিতে পারি না। এর অনেক নিয়ম কানুন আছে। যে কারনে ফাঁকা জায়গা পূরণ হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মোতালেব মিয়া বলেন, লোকবল সংকট তো রয়েছেই। এর জন্য শুধুরোগী নয়, হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মচারীদের ভোগান্তি হচ্ছে। কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি এই লোকবল নিয়ে রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা প্রদানের জন্য।

এসময় তিনি আরো বলেন, এছাড়া আগে যারা নিয়োগ প্রাপ্ত ছিল তাদের অনেকে মারা গেছেন এবং অনেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। এই জায়গাগুলো আর পূরণ না হওয়ায় লোকবল সংকট তৈরী হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। তারা বলছেন নিয়োগ দিবেন।

 

"