যানজট আর ভোগান্তির শহর সিরাজগঞ্জ

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

গাজী শাহাদত ফিরোজী, সিরাজগঞ্জ

ছোটখাটো দূর্ঘটনা আর যানজটের শহরে পরিণত হয়েছে সিরাজগঞ্জ শহর। এসব যেন এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। এর কারণে নির্দিষ্ট সময়ে স্কুল-কলেজে যেতে পারছে না শিক্ষার্থীরা, লেখাপড়ায় দেখা দিচ্ছে নানা অসুবিধা। অপরদিকে পথচারি, চাকরিজীবী, নারী, বয়োবৃদ্ধসহ সব শ্রেণির মানুষদের পোহতে হচ্ছে দূর্ভোগ।

পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, প্রায় সাড়ে ২৮ বর্গ কিলোমিটার সিরাজগঞ্জ পৌরসভার জনসংখ্যা ৩ লক্ষাধিক। ঘনবসতি পূর্ণ শহরের বাজার স্টেশন মুক্তির সোপান, শহীদ নাজমুল চত্তর মোড়, নিউ মার্কেট মোড়, কাঁচা বাজার, বড় বাজার, বাহিরগোলা রোড, পুলিশ লাইন রোড, রেলগেটে সহ শহরের বিভিন্ন মোড় সহ রাস্তায় দিবারাত্রী যানজট আজ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

স্থানীয় ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮০৯ সালের দিকে বেলকুচি থানার তৎকালিন জমিদার সিরাজ উদ্দিন চৌধুরী ‘ভূতের দিয়ার’ মৌজা নিলামে ক্রয়করে সিরাজগঞ্জ শহরের ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন করেন। এর পাশ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে যমুনা, তার উপরে বঙ্গবন্ধু সেতু। ১৫টি ওয়ার্ডের নিয়ে গঠিত সিরাজগঞ্জ পৌরসভা ‘গ’ থেকে ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নিত হয়। কিন্তু প্রথম শ্রেণিতে উন্নিত হলেও পৌরসভার যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে গেছে তৃতীয় শ্রেণির নিচে। শহরের কিছু রাস্তাঘাট অতিসম্প্রতি সংস্কার শুরু করলেও অধিকাংশ রাস্তাঘাট প্রায় যান চলাচলের অযোগ্য। স্থানীরা বিদ্রুপ করে এই সব রাস্তার নাম দিয়েছেন ডেলিভারী রোড, ডাইবেটিস রোড, ব্যাথা রোড ইত্যাদি। সরেজমিনে দেখা যায়, স্থানীয় বাজার স্টেশন থেকে নিউ ঢাকা রোডে গড়ে উঠেছে দূরপাল্লার যাত্রীবাহি বাসস্ট্যান্ড। এইসব গাড়ির কাউন্টার এবং এলামেলোভাবে রাস্তায় রাখা গাড়ি তৈরি করছে যানযট। এছাড়া অনতিদূরেই রেলগেটের চার মাথায় গড়ে উঠেছে ট্রাকের আড়ত। তাছাড়াও মুক্তির সোপান সংলগ্ন স্থান, শহীদ নাজমুল চত্তর মোড়, বাহিরগোলা রোড, বগুড়া রোডে, গোশালা রোডের দক্ষিণে স্থানীয় প্রভাবশালীরা গড়ে তুলেছে পৌরসভার সহায়তায় সিএনজি, ইজিবাইকের স্ট্যান্ড। ফুটপাত দখল করেই চলতে তাদের কাজ। ট্রাফিক নির্দেশ অমান্য করে সার্বক্ষণ চলাচল করে পৌরসভার রহমতগঞ্জে চৌরাস্তায় সিএনজি ও ইজি বাইক স্ট্যান্ডের গাড়ি। তাছাড়াও ফুটপাতের দুই সাইডে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী দোকানপাট। পৌর সভার অধিকাংশ রাস্তার জায়গা দখল করে বস্তিবাসীরা গড়ে তুলেছে আবাসন। পৌর এলাকার জনৈক পথচারি আব্দুস সাত্তার জানান, পৌরসভার মতি সাহেবের ঘাটে যমুনা থেকে উত্তোলিত বালু ভর্তি খোলা ট্রাকের বেপরোয়া যাতায়াত করায় পরিবেশ দূষণ করে চলেছে। এ কারণে জনজীবনও হয়ে উঠেছে অতিষ্ঠ। এর প্রতিবাদ করলে উল্টো বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়।

এদিকে গত ৯ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা মিটিংয়ে যানবাহনের জন্য ব্যাটারি চালিত রিকশাকে যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন পৌরবাসি। তারা বলেন, শহরে প্রায় ১০ হাজার ব্যাটারি চালিত রিকশা নিয়মিত চলাচল করে। এতে শহরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, জনগণের ভোগান্তি বেড়ে গেছে। তবে পৌরসভা থেকে মাত্র ৪ হাজার ব্যাটারি চালিত রিকশার লাইসেন্স প্রদান করা হবে বলে জানা যায়।

পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ইতিমধ্যে শহরে চলাচলের জন্য ১৯শ ব্যাটারি চালিত রিকশার লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। লাইসেন্স বিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহনের সিদ্ধান্তের কথা গত মাসে ১১-১২ তারিখে মাইকে প্রচার করা হলেও তা অদৃশ্য হাতের কারসাজিতে থেমে গেছে। এখন পর্যন্ত পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো কার্যকর ফল দেখা যায়নি।

সিরাজগঞ্জ বিআরটিএ অফিস সূত্রে জানা যায়, আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৪ হাজার সিএনজির লাইসেন্স দেওয়ার অনুমতি আছে। তবে সচেতন মহলের দাবি, লাইসেন্সের তুলনায় ৩ গুণ বেশি গাড়ি রাস্তায় চলাচল করে। আর এর পিছনে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তা কাজ করে চলেছে। যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলা জানা যায়, হাইওয়ে বা বিশ্বরোডে সিএনজি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় সকল সিএনজি আজ শহরমূখী হয়ে উঠেছে। সিএনজিতে সময় কিছুটা কম লাগলেও এ সুযোগে যাত্রীদের পকেট হাতিয়ে নিচ্ছে বেপরোয়া গাড়ী চালকেরা। এতে এক দিকে যেমন জনভোগান্তি ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে ছোটখাটো দুর্ঘটনা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে উঠেছে।

জেলা আইন-শৃঙ্খলার মিটিংয়ে যানজটের কথা স¦ীকার করে প্যানেল মেয়র হেলাল উদ্দিন। এ সম্পর্কে প্রতিদিনের সংবাদকে তিনি বলেন, ‘অবৈধ ইজিবাইক ধরার জন্য একটি টিম মাঠে কাজ করছে। তাদের রোধ করা গেলে যানজট কমে আসবে।’ তবে ইজিবাইক বন্ধ হলে বেকার হয়ে পরা কয়েক হাজার চালকের বিকল্প পেশা কি হবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে তাদের মধ্যে।

 

"