রূপগঞ্জে শত বছরের খাল ঋষিপাড়া-মধুখালী বেদখল

* বালি ফেলে ভরাট করায় মরা খালে পরিণত হয়েছে। * পাঁচ গ্রামের লোকজনের বসতঘর, ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে কয়েক বছর ধরে।

প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

আল-আমিন মিন্টু, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)

‘আমাগ খালটি বালু দিয়া বইরা লাইতাছে। আমাগ সরকারত এমন অকাম করতে দেয় না। তাইলে হেরা এত্ত সাহাস পায় কইত্তনে? আমগকি বাপদাদার ভিটায় থাকতে দিত না!’ মধুখালী এলাকার বাসিন্দা ষাটঊর্ধ্ব জিন্নত আলী বলছিলেন এই কথা। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা ছোড বেলায় বিলেত্তনে মাছ ধরতাম। লাঙ্গল দিয়া জমি চাষবাস করতাম। খালের মধ্যে লাফইয়া লাফাইয়া পড়তাম গোছল করতে। আমগ ছেলেরা এমন করতে আর পারতনা। আমাগ খাল ফিরাইয়া দিব কে?’ খালটি দখলমুক্ত করে প্রবাহমান করার দাবি এলাকাবাসীর।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে শীতলক্ষ্যা ঘেঁষা সবুজ গ্রাম খ্যাত পিতলগঞ্জ। গ্রামের পিতলগঞ্জ মৌজার শতবর্ষি ঋষিপাড়া-মধূখালী খাল নামে পরিচিত। বৃষ্টির ও বর্ষায় পানি নিষ্কাশণের একমাত্র খাল ভূমি খেকোরা জোরপূর্বক বালি ফেলে ভরাট করায় মরা খালে পরিণত হয়েছে। এতে মধূখালী, গুতিয়াব, পিতলগঞ্জসহ ৫ গ্রামের লোকজনের বসতঘর, ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে কয়েক বছর ধরে।

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, এক সময়ের ব্যস্ততম নৌপথ শীতলক্ষ্যা থেকে পিতলগঞ্জের ঋষিপারা হয়ে মধূখালী, গুতিয়াবো, কেয়ারিয়া, বাড়িয়া ছনি হয়ে বালু নদী পর্যন্ত স্থানীয় বিলের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পানি প্রবাহের পথ শতবর্ষি ঋষিপাড়া মধূখালী খাল। কিন্তুবালু ভরাটের কারণে এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়রা আরো জানান, গত ৭ বছর যাবৎ ৫ গ্রামের লোকজনের নিচু জমির বসতঘর, ফসলি জমির উপর জোরপূর্বক অনুমোদনহীন একাধিক আবাসন কোম্পানীর নিয়োজিত প্রভাবশালী লোকজন বালি ফেলে ভরাট করে দখলে নিয়েছে। এ দখলের কবল থেকে বাদ পরছে না সরকারের খালও।

শুধু তাই নয়, পিতলগঞ্জ, গুতিয়াবো, কেয়ারিয়া মৌজা দিয়ে প্রবাহিত এ শতবর্ষি ঋষিপাড়া মধূখালী খালটিও ওই পক্ষ ভরাট করায় মরা খালে পরিণত হয়েছে। এ বালি ভরাটের দখলে যুক্ত রয়েছেন, এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহত সেটেলাইট পূর্বাচল উপশহরের ৩নং সেক্টর এলাকার একাদিক ঠিকাদারও। তারা তাদের জমি উন্নয়নের সময় এ খালেই বালি ফেলে ভরাট করে ফেলে।

এতে মধূখালীর বাসিন্দা মৃত সৈয়দ আলীর ছেলে আলী আহমেদগংদের ১১ বিঘা, গুতিয়াবোর আশকার আলীর ৪ বিঘা, মধূখালীর, সাক্তদ আলীর ছেলে হযরত আলী ও আনীস আলীর বসতঘরসহ ৫ বিঘা, দীল মোহাম্মদসহ স্থানীয় ৪০টি পরিবারের বসতঘর পানি আটকে চরম দূর্ভোগের শিকার হচ্ছে। এসব পরিবারের লোকজন কাঠ ও বাঁশের সাঁকো দিয়ে নিজ বসতঘরে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছে। ওই এলাকার স্কুল, কলেজ, মাদরাসায় পড়–য়া কোমলমতি শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে দেখা গেছে। ওই এলাকার স্থানীয় স্কুলের শিক্ষার্থী রাকিবুল হাসান সাগর বলেন, প্রায় ৬ বছর যাবৎ খালটি বালি ফেলে ভরাট করায় পানি আটকে বাড়ি ঘর অল্প বৃষ্টিতেই পানিতে তলিয়ে যায়। বাড়ির পানি সড়েই না। পানি দীর্ঘদিন আটকে থাকায় মশার উপদ্রব বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই পানিবাহিত রোগ, ডেঙ্গুসহ নানা রোগবালাই বাড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা লুৎফর রহমান বলেন, খালটি বালি ফেলে ভরাট করায় আমরা মধূখালী ও গুতিয়াবো এলাকার শতশত বাসিন্দা পানিতে আটকে কষ্টে জীবন যাপন করছি। তাই প্রশাসনের কাছে জোর দাবী শতবছরের পুরনো এ খালটি উদ্ধার করে স্থানীয় কৃষক ও জনসাধারনের দূর্ভোগ লাঘব করার।

জানতে চাইলে রূপগঞ্জ সদর ইউপি চেয়ারম্যান আবু হোসেন ভুঁইয়া রানু বলেন, খালটি উদ্ধারের জন্য একাধিকবার প্রশাসনকে নিয়ে দখলদারদের সতর্ক করা হয়েছে। আমরা নিয়ম মেনে খালটি উদ্ধার করার চেষ্টা করব। খালটির বেশ কয়েকস্থানেই পানি প্রবাহ বন্ধ রয়েছে বালু ভরাটের কারনে। দেখি আবারও প্রশাসনের সহযোগিতা চাইব। সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ঋষিপাড়া মধূখালী খালটি উদ্ধারের প্রশাসনের পক্ষ থেকে তড়িৎ ব্যবস্থা নেয়া হবে। সরকারের কোন খাল বেদখল রাখা হবেনা। একটু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

"