শার্শায় দুর্গাপূজার মেলা ঘিরে ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা

প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি

শেষ সময়ের রং তুলির আছড়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন যশোরের শার্শা উপজেলার মৃৎশিল্পের কারিগররা। মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত পাল সম্প্রদায়ের শতাধিক পরিবারে এখন চলছে মহা কর্মযোগ্য। কয়েক দিন বাদেই হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গা পূজা। দুর্গা পূজায় প্রতিটি পূজামন্ডপে বসবে মেলা আর এ মেলায় মাটির তৈরি রকমারি পণ্যের পসরা তৈরিতে পাল সম্প্রদায়ের লোকজনের বেড়েছে কর্মব্যস্ততা। সারা বছর মাটির তৈরি পণ্যের তেমন চাহিদা না থাকায় স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা আয়-রোজগারের জন্য এই সময়টাকে বেছে নেন। আর তাই ক্রেতা টানতে শেষ মুহূর্তে চলছে বাহারি নকশা আর নানা রঙের ছটায় ফুটিয়ে তোলার কাজ।

উপজেলার বেনাপোল, গোড়পাড়া, লক্ষণপুর, বালুন্ডা ও বাগআঁচড়া এলাকায় প্রায় শতাধিক পাল সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করে। দীর্ঘদিন ধরে তারা এই পেশায় জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। বাজারে মাটির তৈরি জিনিসপত্রের এখন আর তেমন চাহিদা নেই জানিয়ে লক্ষণপুরের মৃৎশিল্পী অন্নপাল বলেন, ‘বাপ দাদার পেশা বদলাতে পারছিনে, তাই আকড়ে ধরে আছি। সারা বছর মাটির হাড়ি-পাতিল, সরা, কলসসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করে বাজারে বিক্রি করি। তবে ভালো দাম না পাওয়ায় আমাদের সংসার চালাতে বেশ কষ্ট হয়। তাই প্রতি বছর আমরা এই সময়টার জন্য অপেক্ষায় থাকি।’

সামটার রবিন পালের বাড়ি গিয়ে দেখা যায় তার মেয়ে লক্ষ্মীরানী পাল ও ছেলে লক্ষণ পাল দুই ভাইবোন মিলে বাবাকে কাজে সহায়তা করছে। এ সময় লক্ষণ বলেন, ‘আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি, বোনটা পড়ে ফাইবে। স্কুলে যাওয়ার আগে আর বাড়ি এসে এখন খেলনায় রং করি। পূজোর সময় এসব খেলনা বেচে আমরা আনন্দ করি।’

সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নারী-পুরুষ সবাই মিলে তৈরি করছেন মাটির হাড়ি-পাতিল, কড়াই, তৈজসপত্র, পুতুল, তরমুজ, আম, জাম, কাঁঠাল, টিয়া, হাঁস, মোরগ, হাতি, বাঘ, হরিণ, মাছ, গরু, বিড়াল, চাকা লাগানো নৌকা ও খেলনা সামগ্রী। বাগআঁচড়ার মায়ারানী পাল বলেন, ‘পূজার সময় আমাদের দম ফেলার সময় থাকে না। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। তবে যে পরিমাণ পরিশ্রম করি সে অনুযায়ী আমাদের লাভ থাকে না। অন্য জায়গায় কাজ না করে বাড়ি বসে বসে আমরা এই সব কাজ করি বলে ভালো লাগে।’

জামতলার মৃৎশিল্পী জগোৎন্নাথ পাল বলেন, ‘ক্রেতাদের পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে বাস্তবের সঙ্গে অনেকটা মিল রেখে নানা রঙের মিশ্রণ ঘটিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয় এসব পণ্য।’

মৃৎশিল্পী বিশাখা পাল বলেন, ‘মাটির জিনিসপত্র তৈরি করে আমরা মেলায় বিক্রি করি। শিশুরা মাটির তৈরি খেলনা বেশি পছন্দ করে।’

শিশুরা কোন জাতীয় খেলনা বেশি পছন্দ করে জানতে চাইলে জামতলার বরুন পাল বলেন, ‘মাটির জিনিসের মধ্যে হাড়ি-পাতিল, টিয়া পাখি, চাকা লাগানো নৌকা শিশুরা বেশি পছন্দ করে। নারী ক্রেতারাই মাটির তৈরি ব্যাংকগুলো বেশি কেনেন।’

মৃৎশিল্পী চায়না রানী পাল বলেন, ‘আমাদের এই ব্যবসা এখন আর খুব একটা বেশি চলে না। পূজা আসলে আমরা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের খুশির জন্য মাটির খেলনা তৈরি করি। তাও বাজারে প্লাস্টিকের খেলনার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে এসব মাটির তৈরি খেলনা ও হাড়ি-পাতিল।’

লোলিত পাল বলেন, ‘আমাদের এই ব্যবসাটা বাপ-দাদারা করেছে, সেই ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য এখনো ছাড়তে পারছি না। সরকার আমাদের দিকে একটু সুদৃষ্টি দিলে আমরা আমাদের বাপ-দাদার ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে পারব।’

জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক বৈদ্যনাথ দাস বলেন, ‘শার্শা উপজেলার বেনাপোল, গোড়পাড়া, লক্ষণপুর, বালুন্ডা ও বাগআঁচড়া এলাকায় প্রায় শতাধিক পাল সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করেন। এ অঞ্চলের পাল সম্প্রদায়ের লোকজন দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখনো পেশা বদল না করে এই মৃৎশিল্পের কাজ করে যাচ্ছেন।’

 

"