জেলেরা পাচ্ছেন না সরকারি সহায়তা

বেড়া জেলেপল্লীতে নেই পূজার আনন্দ

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

খালেকুজ্জামান পান্নু, পাবনা

পাবনার বেড়া উপজেলার জেলে পরিবারে পূজার আনন্দ যেন নিরানন্দে পরিণত হয়েছে। সরকারি সহায়তা না থাকায় উপজেলার হাজার জেলে পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। বেড়াকে ‘ইলিশ জোন’ হিসেবে ঘোষণা না করায় এই সহায়তা বঞ্চিত হচ্ছে তারা।

জানা যায়, পাবনার বেড়া উপজেলায় পাঁচ সহস্রাধিক জেলেদের অন্যতম অর্থনৈতিক উৎস পদ্মায় ইলিশ ধরা। এ উপজেলায় ইলিশের উৎপাদন প্রতি বছরই বাড়ছে। কিন্তু বেড়া উপজেলাকে ইলিশ জোন হিসেবে ঘোষণা করেনি প্রশাসন। কিন্তু সরকারি ভাবে ইলিশ জোন হিসেবে ঘোষণা না করলেও ইলিশ ধরায় রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। ফলে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধের মৌসুমে উপজেলার মৎস্যজীবীদের জুটছে না সরকারি সহায়তা। এই সময়ে বেকার হয়ে পড়া মৎস্যজীবীরা দিন কাটছে খেয়ে না-খেয়ে। এদিকে, দুর্গা পূজা উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বইছে উৎসবের আমেজ। কিন্তু বেড়া উপজেলার জেলেপাড়াগুলোতে নেই সেই ভাব।

জেলা ও উপজেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ইলিশ রক্ষায় এবার প্রজনন মৌসুমে ৭ অক্টোবর থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত এ মাছ ধরা ও বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে সরকার। ২২ দিনের এ নিষেধাজ্ঞার সময় দেশের ২৯ জেলার ১১২টি উপজেলার ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৭০৯টি জেলে পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় ২০ কেজি করে চাল দেবে সরকার। অথচ বেড়া উপজেলার নদ-নদী থেকেও ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ থাকলেও উপজেলার জেলেরা সরকারি চাল পাবেন না।

মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ইলিশ জোন হিসেবে ঘোষণা করা না হলেও পাবনার বেড়া, সুজানগর, পাবনা সদর ও ঈশ্বরদী উপজেলাকে ইলিশের কমান্ড এরিয়া হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে বেড়া উপজেলায় ইলিশের উৎপাদন প্রতি বছরই বাড়ছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ জেলায় ইলিশের উৎপাদন ছিল ১৩০ টন। এর মধ্যে বেড়ায় উৎপাদিত হয়েছে ৩৫ টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জেলায় ইলিশের উৎপাদন বেড়ে হয় ১৬০ টন এবং বেড়া উপজেলায় উৎপাদন হয় ৩৭ টন। এর মধ্যে বেড়া উপজেলার নগরবাড়িতে ও ঢালারচরের কাছে পদ্মা-যমুনার মিলনস্থলে প্রতি বছর মা ইলিশের ডিম ছাড়ার পরিমাণ বাড়ছে।

এদিকে, উপজেলা মৎস্য অধিদফতরের সূত্র জানায়, বেড়ায় নিবন্ধিত মৎস্যজীবী রয়েছেন দুই হাজার ৬৯০ জন। তবে উপজেলার কয়েকটি মৎস্যজীবী সমিতির হিসাব অনুযায়ী বেড়ায় মৎস্যজীবীর প্রকৃত সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও বেশি। অন্তত ১০-১২ জন মৎস্যজীবীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা চলাকালে প্রতি বছরই খুব কষ্টে দিন কাটে জেলেদের। প্রথম দিকে জেলেরা মাছ ধরার জন্য নদীতে না গেলেও নিষেধাজ্ঞার শেষ পর্যায়ে নিরুপায় হয়ে কেউ কেউ গোপনে মাছ ধরতে যান। মৎস্য কর্মকর্তা ও মৎস্যজীবীদের মতে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধকালে উপজেলার জেলেদের সরকারি সহায়তার আওতায় নিয়ে আসা হলে ইলিশ ধরা অনেক কমে যাবে।

যমুনাপাড়ের কৈতলা গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মৎস্যজীবী বলেন, ‘এই সময়ে আমরা কেউই ইলিশ ধরব্যার চাই না। কিন্তু ঘরে যদি চুলা না জ্বলে তখন তো আমাগরে কিছুই করার থাহে না। বাধ্য হয়া গাঙে মাছ ধরব্যার যাই। কি করুম খাইয়্যে পইড়্যা তো বাঁচোন লাগব।’

এদিকে, আগামী ১৬ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে দুর্গা পূজা। উপজেলার হিন্দু জেলে পল্লিগুলোতে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায় সেখানে নেই পূজা উপলক্ষে উৎসবের আমেজ। ইলিশ নিষিদ্ধের মৌসুমে জেলেরা বেকার হয়ে পড়ায় এবং সরকারি সহায়তা না জোটায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে বেড়া পৌর এলাকার পায়না মহল্লার ভোলা হালদার, কুশীনাথ হালদারসহ চার-পাঁচজন হিন্দু জেলে জানান, বেকার হয়ে থাকায় সংসার চালানোই কষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলেরা জানান, পূজার কেনাকাটা করার সামর্থ্য কারও নেই। তাই এবারের পূজায় উৎসবের আমেজ নেই তাদের মধ্যে।

পাবনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবদুর রউফ জানান, জেলার সব মৎস্যজীবীর জন্য সরকারি সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু কেবলমাত্র সুজানগর উপজেলার জন্য ১ হাজার ২৫০টি ভিজিএফ কার্ড বরাদ্দ এসেছে। জেলার সব মৎস্যজীবীর জন্য যাতে ভিজিএফ কার্ড বরাদ্দ হয় সে ব্যাপারে চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

বেড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শাম্মী শিরিন বলেন, ‘ইলিশ ধরা নিষিদ্ধকালে উপজেলার অনেক জেলেকে বেকার হয়ে থাকতে হয়। এ সময় খুব কষ্টে তাদের দিন কাটে বলে অনেকেই লুকিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা চালান। তবে আমাদের কঠোর অভিযানের কারণে তারা তেমন সফল হতে পারেন না। সরকারি সহায়তা পেলে হয়তো নিষিদ্ধ সময়ে জেলেরা মাছ ধরা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকবেন।’

 

"