বন্যার্তদের সহযোগিতার টাকায় লাইব্রেরি!

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

ক্ষতিগ্রস্তরা এখনো ঝুপড়ি ঘরে

আল মামুন জীবন, বালিয়াডাঙ্গী (ঠাকুরগাঁও)

ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে পানিবন্দী মানুষের সহযোগিতার জন্য স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা অর্থ এক বছরেও বিতরণ না করে গণগ্রন্থাগার নির্মাণ করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। উপজেলা পরিষদ চত্বরে এই গণগ্রন্থাগার নির্মাণে ব্যয়িত অর্থ স্থানীয় এনজিও, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিক এবং সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একদিনের বেতন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল।

বন্যার্তদের সহযোগিতার জন্য উত্তোলনকৃত টাকা দিয়ে স্থানীয়দের জন্য উপজেলা পরিষদ চত্বরে পাবলিক লাইব্রেরি নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানালেন ওই সময়ে দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাহী আ. মান্নান। বর্তমানে তিনি পঞ্চগড় জেলায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত আছেন। গত মাসের শেষের দিকে পদোন্নতি পেয়ে পঞ্চগড়ে যোগদান করেন।

এদিকে বন্যার্তদের জন্য দেওয়া টাকা বিতরণ না করে লাইব্রেরিতে দেওয়ার খবরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সহায়তাকারীরা। তারা বলছেন, লাইব্রেরি নির্মাণ বাস্তবায়নকারী হিসেবে উপজেলা প্রশাসন দেখানো হয়েছে। অথচ এটা আমাদের টাকায় নির্মিত। যার ক্রেডিট নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। তবে পদোন্নতি প্রাপ্ত ইউএনও’র দাবি, এটা উপজেলা পরিষদের অনুষ্ঠিত মাসিক সভায় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বন্যার্তদের সহায়তার টাকা লাইব্রেরিতে ব্যবহার করা হয়েছে। গত বছরের আগস্ট মাসে ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার চার ইউনিয়নে আকস্মিকভাবে বন্যা দেখা দেয়। আকস্মিক ওই বন্যায় উপজেলার ধনতলা, পাড়িয়া, আমজানখোর ও বড়পলাশবাড়ী ইউনিয়নের বেশ কিছু গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পরে। বাড়ী ঘর ভেঙ্গে গেলে আশ্রয় নেয় আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। ধীরে ধীরে পানি নেমে যাওয়ার পর তারা স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতা কোনমতে ছোট বাঁশের ঘর তুলে এখনও জীবনযাপন করছেন। ওই সময় বন্যার্তদের সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি স্থানীয় এনজিও, রাজনৈতিক, সাংবাদিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকগুলো সহযোগিতার হাত বাড়ান। মানুষের অসহায়ত্ব দেখে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা পরিষদ থেকে রেজুলেশনের মাধ্যমে বন্যার্তদের সহযোগিতার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ সিদ্ধান্তে সকল সরকারি, বেসরকারি চাকরি জীবীরাও একদিনের বেতন ৫ লাখ ২৮ হাজার টাকা এবং স্থানীয় একটি অনলাইন পত্রিকা বালিয়াডাঙ্গী২৪ ডট কম ১৫ হাজার টাকা বন্যার্তদের জন্য দেন। কিন্তু বন্যার্তদের সহযোগিতার নামে এ টাকা সংগ্রহ করার একবছর পেরিয়ে গেলেও তাদের সহযোগিতা করা হয়নি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার অনেক মানুষ এখনো ঝুপরিতেই বসবাস করছেন। একই ঘরে তাদের পরিবার পরিজন ও গরু-ছাগল নিয়ে খুব কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। কেউ কেউ একটি ঝুপরিতেই গরু-ছাগলের পাশাপাশি স্কুল পড়ুয়া ছেলে মেয়েদের নিয়ে বসবাস করছে।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড়পলাশবাড়ী ইউনিয়নের কাশুয়া খাদেমগঞ্জ খেরবস্তি গ্রামের বিশ্বাসের স্ত্রী ফাতেমা জানান, আমার চার ছেলেমেয়েসহ ছয় সদস্যের পরিবার। বড়মেয়ে স্থানীয় দাখিল মাদরাসার ৭ম শ্রেণির ছাত্রী। আমার দুটি ঘর ছিল। গত বছর বন্যায় একটি সম্পুর্ণ ও একটির অর্ধেকটা ভেসে যায়। এখন এই অর্ধেক ঘরে চার ছেলেমেয়ে, স্বামী-স্ত্রী ও গরু ছাগল নিয়ে খুব কষ্টে বসবাস করছি। তিনি বলেন, একবছর পার হলেও এখনও সরকারি বেসরকারি তেমন কোন সহযোগিতা পাইনি।

একই এলাকার আফিজা বেগম জানান, গত বছর ফিতরা ও খয়রাতির টাকা দিয়ে এই ঝুপড়িটা তুলেছি। বাবারে, বন্যার সময় সাহেবরা সাহায্য দিবে বলছিল কিন্তু এক বছর পার হলেও কোন সাহায্য পাইনি। ওই গ্রামের আব্দুল মালেকের ছেলে আফিজুল হকও একই কথা বললেন। এ রকম অসহায় অবস্থায় দিনাতি পাত করছেন ওইসব এলাকার অসংখ্য লোক।

বড়পলাশবাড়ী ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য বিশু মোহাম্মদ ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, উপজেলা প্রশাসনের প্রধান সরকারি, বেসরকারি চাকরিজীবীদের একদিনের বেতন বন্যার্তদেন জন্য সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও কেন ওই টাকা বন্যার্তদেন মাঝে বিতরণ করেননি এটা আমার বোধগম্য নয়। একদিনের বেতন প্রদানকারী উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মচারি জানান, আমরা আমাদের কষ্টার্জিত বেতনের টাকা বন্যার্তদেন জন্য দিয়েছি। বন্যার্তদের সহযোগিতা না করে লাইব্রেরি বানিয়েছেন। উপজেলা পরিষদে কি টাকার অভাব? এ ঘটনা প্রকাশ হবার পর ভিন্ন খাতে টাকা ব্যয় করায় সহযোগিতা প্রদানকারী অনেকেই এ টাকা ফেরত চেয়েছেন।

পদোন্নতি জনিত কারণে বদলি হওয়া ইউএনও (বর্তমানে পঞ্চগড়ের এডিসি) আব্দুল মান্নানের কাছে এ বিষয়ে ফোনে জানতে চাইলে প্রথমে তিনি এড়িয়ে যান। প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘আমি এই মুহুর্তে বালিয়াডাঙ্গীতে নেই। ওই টাকা পাবলিক লাইব্রেরিতে দেওয়া হয়েছে।’ তবে প্রতিদিনের সংবাদ অফিস থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পবিরার অসহায় অবস্থায় থাকার পরও তাদের টাকা না দিয়ে কেন লাইব্রেরিতে ব্যবহার করা হয়েছেÑএমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা উপজেলা পরিষদে মাসিক সভায় সবার উপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজটা করা হয়েছে।’ জানতে চাইলে বালিডাঙ্গির বর্তমান ইউএনও মাসুদুর রহমান মাসুদ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘এই সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিষয়টা আমি আপনার কাছ থেকে জানলাম। এ নিয়ে এর আগে একদিন কথা উঠে ছিল। তবে আমি ছুটি থেকে ফিরলে বিস্তারিত জানাতে পারবো।’

 

"