মুরাদনগরে প্রধান শিক্ষক যখন দফতরি!

প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

মো. আরিফুল ইসলাম, মুরাদনগর (কুমিল্লা)

সকাল ১০টায় ঢুকতেই চোখে পরলো একজন ভদ্রলোক ঘন্টা বাজাচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা ঘন্টার শব্দ শুনে ক্লাস রুমে ঢুকছে। কিন্তু চোখে পরছেনা কোন শিক্ষক। অপরদিকে যিনি স্কুলের ঘন্টা বাজাচ্ছেন তাকে দপ্তরীর মতো মনে হচ্ছেনা। মূহুর্তের মধ্যে মনে অনেক প্রশ্নের তৈরী হলো। স্কুলের ঘন্টা দপ্তরী বাজাবে সেটাই স্বাভাবিক আর শিক্ষক আছে হয়তো চোখে পরছে না। তাই মনে কোন প্রকার দ্বিধা না রেখে, ঘন্টা হাতে ব্যাক্তির কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম আপনাদের প্রধান শিক্ষক কোথায়। লোকটি বললেন আমার সঙ্গে আসেন, তিনি অফিস রুমে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসে বললেন জি আমি প্রধান শিক্ষক জসিম উদ্দিন। এমনই ঘটনা ঘটছে কুমিল্লা মুরাদনগর উপজেলার কদমতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রধান শিক্ষক জসিম উদ্দিন সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বলেন, বিদ্যালয় বিহিন এলাকায় বিদ্যালয় নির্মান প্রকল্পের আওতায় এ বিদ্যালটি স্থাপন করা হয়। কোন সহকারি শিক্ষক ও দপ্তরী না থাকায় যে উদ্দেশ্যে বিদ্যালয়টি স্থাপন করা হয়েছে তার কিছুই হচ্ছেনা। আমি নিজেই পাঠদানের পাশাপাশি দাপ্তরিক ও দপ্তরীর কাজসহ স্কুলের সকল কাজ করতে হচ্ছে। প্রায় সময় দাপ্তরিক কাজে আমাকে উপজেলা সদরে সময় দিতে হয়। তখন বিদ্যালটি অভিভাবকহিন হয়ে পড়ে। এত করে বর্তমানে স্কুলটিতে থাকা প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম চরম ভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন আমি কি প্রধান শিক্ষকের কাজ করবো? নাকি সহকারি শিক্ষকের ক্লাস নিবো? নাকি দপ্তরীর হয়ে স্কুলের ঘন্টা বাজাবো? অভিভাবকরাও প্রতিদিনেই শিক্ষক আনার জন্য আমাকে চাপ দিচ্ছেন।

তেমনি রয়েছে উপজেলার চুলুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির অবস্থা। একটি মাত্র ক্লাস রুম নিয়ে চলে তাদের পাঠদান।

কেবল ওই বিদ্যালয় গুলোতে নয়, উপজেলার অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকের সংকট প্রকট আকার ধারন করেছে। শিক্ষক সংকট প্রকট হওয়া ১৭টি বিদ্যালয়ে ৭৩টি সহকারি শিক্ষকের পদ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৫০টি পদ শূণ্য রয়েছে। বর্তমান সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়ন ও মোট জনসংখ্যার শতভাগ প্রাইমারী শিক্ষা নিশ্চিত করনের লক্ষ্যে কাজ করলেও সব দিকে পিছিয়ে রয়েছে এ উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলো। পাঠদানের পাশাপাশি দাপ্তরিক কাজে বেশি সময় দিতে হচ্ছে শিক্ষকদের।

উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার চুলুড়িয়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কদমতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪টি করে সহকারি শিক্ষকের পদ থাকলেও সবকয়টিই শূণ্য রয়েছে। ভাঙ্গানগর ৪টি সহকারি পদে আছে একজন, কাজিয়াতল দক্ষিনে ৮টি সহকারি পদে আছে ২ জন, কৈজুরী ৭টি সহকারি পদে আছে ২ জন, সাহেবনগরে ৪টি সহকারি পদে আছে ২ জন, নোয়াকান্দিতে ৪টি সহকারি পদে আছে ২ জন, দৌলতপুরে ৪টি সহকারি পদে আছে ২ জন, আন্দিকুটে ৯টি সহকারি পদে আছে ৬ জন, পাহাড়পুরে ৮টি সহকারি পদে আছে ৪ জন, কুরুন্ডিতে ৪টি সহকারি পদে আছে ২ জন, আলীরচর ৪টি সহকারি পদে আছে ৩ জন, লক্ষীপুরে ৪টি সহকারি পদে আছে ৩ জন ও নোয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫টি সহকারি পদের মধ্যে রয়েছে ৪ জন শিক্ষক রয়েছে।

কদমতলি স্কুলের শিক্ষার্থী মুজাহিদুল হাসান ও আলীনূর আক্তার জানান, তাদের বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ছাড়া আর কোন শিক্ষক নেই। তিনি অফিস কাজ থেকে শুরু করে সকল শ্রেণির সকল পাঠদান কাজ করতে হয়।

কৈজুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘বিদ্যালয়টিতে ৫২৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে পড়াতে অন্তত ১০ জন শিক্ষক প্রয়োজন হলেও আছেন মাত্র দুই জন। বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজে আমি যখন ব্যাস্থ থাকি ওই সময় দুইজন শিক্ষককে একসঙ্গে তিনটি শ্রেণিতে পড়াতে হয়।’

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন ১৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘ওই বিদ্যালয় গুলোর শিক্ষক সংকটের বিষয়টি আমাদের জানা আছে। সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদের বিপরীতে শিক্ষকের চাহিদা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। আশাকরি অল্প দিনের মধ্যেই বিদ্যালয়গুলোতে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে।’

 

"