কাঁকরোল চাষে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারে আগ্রহী চাষিরা

* উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় সবজি চাষে ফাঁদটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে * মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে এ অঞ্চলের কাঁকরোল রফতানি করা হচ্ছে

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

হাসমত আলী ও জোনাহিদ হাসান সাগর, কালীগঞ্জ (গাজীপুর)

গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের বিরতুল গ্রামটি বিষমুক্ত সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত। বিশেষ করে খরিফ মৌসুমে এ গ্রামের প্রধান সবজি কাঁকরোল। তাই গ্রামটি এখন কাকরোলের গ্রামে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এই কাঁকরোল বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। আর এই কাঁকরোল চাষে স্থানীয় চাষিরা ব্যবহার করছে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ। যা ব্যবহার করে চাষিরা বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠছে। দিন যত যাচ্ছে স্থানীয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এই ফাঁদের জনপ্রিয়তাও।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কাকরোল চাষে স্থানীয় চাষিরা ব্যাপক হারে ‘সেক্স ফেরোমন ফাঁদ’ ব্যবহার করছেন। ওই গ্রামের কাঁকরোল চাষি নিহার চন্দ্র দাস জানান, খরিফ মৌসুমে আমাদের প্রধান ফসল কাকরোল। আমাদের এই উৎপাদিত কাকরোলের চাহিদা ঢাকাসহ পার্শ্ববর্তী জেলাতেও রয়েছে। এমনকি দেশের চৌহদ্দী পেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কাঁকরোল রফতানিও করা হচ্ছে।

তিনি আরো জানান, গত বছর ৪০ শতাংশ জমিতে কাঁকরোল চাষ করি। এ বছর এক একর জমিতে কাঁকরোল চাষ করেছি। যেহেতু আমাদের কাঁকরোল বিদেশে যাচ্ছে তাই কৃষি বিভাগের পরামর্র্শে কীটনাশক ব্যবহার না করে জৈবসার ও সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করছেন। এতে যেমন উৎপাদন খরচ কমছে সেই সঙ্গে বিষমুক্ত সবজির চাহিদাও বাড়ছে।

বিরতুল গ্রামের আরেক চাষি সালামত সরকার বলেন, কাঁকরোল, লাউ ও কুমড়ায় মাছি-পোকার আক্রমণ বেশি হয়। কীটনাশক ব্যবহারে এ পোকা তেমন একটা দমন হয় না। আবার টাকাও বেশি খরচ হয়। ফলে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মনির মোল্লার পরামর্শে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করছি। এখন খরচ কমেছে এবং পোকাও বেশি মারা যাচ্ছে। পাশাপাশি বিষমুক্ত সবজিও খেতে পারছি।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ফারজানা তাসলিম জানান, কুমড়া জাতীয় সবজিতে মাছি পোকার আক্রমণ বেশি দেখা যায়। স্ত্রী মাছি-পোকা কচি সবজিতে অভিপজিটর ফুটিয়ে ভেতরে ডিম পাড়ে যা থেকে পরবর্তীতে কীড়া হয় এবং ফল পচে যায়। তাই এ পোকা দমনে বাইরে থেকে কীটনাশক স্প্রে করে খুব একটা কাজ হয় না।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু নাদির সিদ্দিকী বলেন, ‘কুমড়া জাতীয় সবজির মাছি পোকা দমনের একটি কার্যকরী পদ্ধতি হচ্ছে ‘সেক্স ফেরোমন ফাঁদ’ এর ব্যবহার। এ ফাঁদে স্ত্রী পোকার গন্ধযুক্ত একটি লিউর প্লাস্টিকের বয়ামে ব্যবহার করা হয়। চাষিরা যাকে তাবিজ বলে থাকেন। এ লিউরের গন্ধে পুরুষ পোকা ফাঁদের ভেতর প্রবেশ করে উড়াউড়ি করতে থাকে এবং প্লাস্টিকের বয়ামে বাধা পেয়ে পাখায় আঘাত পেয়ে নিচে পড়ে যায়। বয়ামের নিচে যেহেতু সাবান গুড়া পানি ব্যবহার করা হয় তাই পোকা আর উড়তে পারে না এবং ফাঁদে পড়ে মারা যায়। বয়ামের ভেতরে ব্যবহৃত ফেরোমন লিউরের দাম ৩০-৩৫ টাকা এবং বয়ামের দাম ৩০-৩৫ টাকা, প্লাস্টিক বয়াম বা বোতল কেটেও ব্যবহার করা যায়। সে ক্ষেত্রে আলাদা করে বয়াম কেনার দরকার নেই। এক বিঘা জমিতে ১২-১৩টি সেক্স ফেরোমন ফাঁদ প্রয়োজন হয়। একটি লিউর এক মৌসুম ব্যবহার করা যায়।’

তিনি আরো জানান, বিরতুলের কাঁকরোল স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েও বিদেশে রফতানি হচ্ছে এবং দিন দিন কাকরোল উৎপাদন বাড়ছে। মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের কারণে কাকরোলের চালান যেন বিদেশ থেকে ফেরত না আসে এ ব্যাপারে কৃষি বিভাগ মৌসুম শুরুর প্রথমেই চাষিদের জৈবসার ব্যবহার ও সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং নিয়মিত মনিটরিং করা হয়। চাষিদের মাঝে পরিবেশবান্ধব এ প্রযুক্তিটি আরো জনপ্রিয় করার জন্য রাজস্ব প্রকল্প ও ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রোগ্রাম ফেজ-২ প্রজেক্টের মাধ্যমে চাষিদের মাঝে বিনামূল্যে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ বিতরণ করা হয়েছে।

"