কুবিতে ছাত্রীদের আবাসন সংকট

হলে টেবিলও ভাগ করে পড়তে হয়

২ হাজার ৩৯৭ ছাত্রীর মধ্যে আবাসান আছে মাত্র ২০০ জনের। ৮৮ শতাংশই আবাসন সুবিধাবঞ্চিত

প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

স্বকৃত গালিব, কুবি

সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) ছাত্রীদের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি ছাত্রীদের আবাসন সুবিধা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ হাজার ৩৯৭ ছাত্রীর মধ্যে আবাসন আছে মাত্র ২০০ জনের। সে হিসাবে ৮৮ শতাংশ ছাত্রীর আবাসিক সুবিধা নেই। ক্যাম্পাসের একমাত্র ছাত্রী হলের অবস্থাও বাজে। ফলে বাধ্য হয়ে শহরে বা গাদাগাদি করে হলে বাস করছে তারা। তবে এই অভিযোগ মানতে নারাজ হল প্রভোস্ট।

আবাসন সুবিধার অভাবে ছাত্রী ভোগান্তি চরমে উঠেছে। বিশেষত যারা মফস্বল থেকে পড়াশোনার জন্য এসেছে তাদের অবস্থা শোচনীয়। এদিকে কুমিল্লা শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় দূরবর্তী ও পাহাড়ি এলাকায় হওয়ায় আছে নিরাপত্তার অভাব। ফলে বেশিরভাগ ছাত্রী কুমিল্লা শহরে থেকে পড়াশোনা করেন। আবার যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকায় থাকে তাদের কাছে নিরাপত্তার কথা বলে বেশি ভাড়া আদায় করে মেস মালিকরা। ফলে একদিকে যেমন তাদের যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ বেড়েছে, তেমনিভাবে তাদের নিরাপত্তাও চরম ঝুঁকির মধ্যে আছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, কুবিতে মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৬ হাজার ১৩৮ জন। তার মধ্যে ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ২ হাজার ৩৯৭ জন ছাত্রী। এর বিপরীতে আবাসিক ছাত্রীদের সিট সংখ্যা ২০০। এর মধ্যেই গাদাগাদি করে থাকে ২৯৯ জন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪টি হলের মধ্যে শুধুমাত্র নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী হলটি ছাত্রীদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮৮ শতাংশ ছাত্রীর কোনো আবাসিক সুবিধাবঞ্চিত।

আবাসিক-অনাবাসিক ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আবাসন সুবিধা সংকুচিত হওয়ায় ছাত্রীদের একটি মাত্র হলে সিট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। আবার সিট পাওয়া গেলেও প্রথম কয়েক বছর কাটে অত্যন্ত কষ্টে এবং সঙ্গে রয়েছে হলের অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের দুই হাত প্রস্থের হসপিটালের ব্যবহৃত লোহার বেডে ডাবলিং করে প্রতি রুমে ৮-১০ জন করে থাকতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একেকটি রুম একেকটি শরণার্থী শিবির হয়ে ওঠে। দুইজন ছাত্রী মিলে একটি টেবিল ব্যবহার করতে হয়। ফলে অনেক সময় বারান্দায় গিয়ে বা বিছানাতে বসে পড়াশোনা করতে হয় তাদের। ৮-১০ জন থাকার রুমে মাত্র দুইটি ফ্যান থাকায় প্রচ- গরমে শিক্ষার্থীদের করতে হয় কষ্ট। ফলে রাতে ছাত্রীরা ঠিক মতো ঘুমাতেও পারে না। যা পরবর্তীতে তাদের পড়াশোনা সমস্যা হয়।

প্রত্যেক ছাত্রীর জন্য রয়েছে ১-২টি করে লকার এর ফলে কাপড় রাখার কোনো জায়গা না থাকার কারণে কেউ রশি টানিয়ে, কেউ স্তূপ করে বিছানার কোণে আবার কেউ ট্যাংকের ভেতরে কাপড় রাখতে বাধ্য হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিটি রুমে গাদাগাদি করে ছাত্রী থাকার পাশাপাশি পুরো হলের ভেতর অবকাঠামোসহ হাজারো সমস্যা। ছাত্রী হলের প্রত্যেক তলাতে ৪টি টয়লেট, ৩টি গোসলখানা, ৩টি বেসিন থাকলেও সবই এখন ব্যবহার অনুপযোগী। নিচের তলায় টয়লেট ও গোসল খানার দরজা ভাঙা থাকায় তা ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। আবার নিচতলা ও তিনতলাতে ত্রুটির কারণে পানি সাপ্লাই বন্ধ রয়েছে। এদিকে হলটির ২৯৯ ছাত্রীর জন্য মাত্র ২টি রান্না করার চুলা আবার সেই চুলাগুলো নষ্ট হয়ে গেছে অনেক দিন আগেই। ফলে বাধ্য হয়েই তাদের হলের নিম্নমানের খাবার খেতে হয় তাদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হলের আবাসিক এক ছাত্রী বলেন, ‘এমনিতে সবাই হলে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। তারপরও রয়েছে ঘিঞ্জি পরিবেশ, গরমে ফ্যানের কষ্ট, টয়লেটের সমস্যা, পানির সমস্যা, রান্না করা চুলার সমস্যা। ডাইনিংয়ে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করা হয় যার ফলে ছাত্রীরা হল ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে।’

লিনা, আফরিন, মিমি, ফ্লোরা, আফসানা, সায়মাসহ কয়েকজন ছাত্রী প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘হলই আমাদের ক্যাম্পাস জীবনের সব সুখ-দুঃখের সাথী। আমরা চাইলেও আমরা এই সময়টাকে ভুলতে পারব না। এই জীবন এক অবিরাম সুখের ধারা। তবে অনেকের ইচ্ছা থাকলেও এই মধুর সময় থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। কারণ হলের সিট অপর্যাপ্ত।’

কুবি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও আবাসিক ছাত্রী আইভি রহমান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘হলের অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা হলে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সমস্যা সমাধানের জন্য চেষ্টা করি।’ ছাত্রীদের আবাসন সংকট নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, ‘সাধারণ ছাত্রীদের সঙ্গে নিয়ে আবাসন সংকট দূর করার জন্য আন্দোলন চলিয়ে যাচ্ছি, আবাসন সংকট দূর না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব।’

ছাত্রী হলের অভ্যন্তরীণ সব সমস্যার কথা অস্বীকার করে নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী হলের প্রভোস্ট এন এম রবিউল আওয়াল চৌধুরী বলেন, ‘আমার জানা মতে ছাত্রী হলের অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা নেই যদি কোনো সমস্যা নিয়ে কেউ অভিযোগ করে তাহলে দ্রুত সমস্যার সমাধান করা হবে।’ অবাসন সংকট নিয়ে এই অধ্যাপক বলেন, ‘নির্মাণাধীন শেখ হাসিনা হলের কাজ শেষ হলে সমস্যা অনেকটাই সমাধান হয়ে যাবে।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. মো. আবু তাহেরের (চলতি দায়িত্ব) কাছে বক্তব্য নেওয়ার জন্য মুঠোফোনে ও রেজিস্ট্রার অফিসে বার বার যোগাযোগ করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

"