রংপুরের রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ির অবাধ চলাচল

* ৪৩ বছরের পুরনো বাস চলছে সড়কে * প্রতিনিয়ত ঘটছে প্রাণঘাতির মতো ঘটনা * সংশ্লিষ্ট বিভাগের উদাসীনতা বলে দাবি স্থানীয়দের

প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আবদুর রহমান রাসেল, রংপুর
ama ami

নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে রংপুর অঞ্চলে বেড়েই চলেছে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা। শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থে চলাচলের অনুপযোগী ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন এসব গাড়ি রাস্তায় ছেড়ে দিচ্ছে মালিকপক্ষ। ফিটনেসবিহীন এসব গাড়ির কারণে সড়ক-মহাসড়কগুলোয় পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে সড়ক দুর্ঘটনা। এতে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। সব মহল থেকে ফিটনেসবিহীন এসব গাড়ি চলাচলে কড়াকড়ি আরোপের দাবি ওঠানো হলেও তেমন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট বিভাগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রংপুর থেকে বিভিন্ন জেলা ও আন্তঃউপজেলায় চলমান অধিকাংশ বাসের রেজিস্ট্রেশন নেই। রংপুর বিআরটিএর তথ্য মতে, রংপুরে রেজিস্ট্রেশনকৃত বাসের সংখ্যা ১১৮টি। এর মধ্যে ফিটনেস নেই ১৫টি বাসের। এ ছাড়া, সরকারি-বেসরকারি তিন শতাধিক কার ও মাইক্রোর ফিটনেস নেই।

এ বিষয়ে জেলা মোটর মালিক সমিতি জানায়, রংপুর থেকে আন্তজেলা ও আন্তঃউপজেলাগামী বাস রয়েছে চার শতাধিক। যেগুলো মালিক সমিতির নিয়ন্ত্রণাধীন। এ ছাড়া পাশের জেলাগুলো থেকেও প্রায় সমানসংখ্যক বাস রংপুর হয়ে যাতায়াত করে। যেগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

সরেজমিনে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রংপুর থেকে গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুরগামী অধিকাংশ বাসের ফিটনেস নেই। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাসের রোড পারমিট এবং রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদও শেষ হয়েছে। অনেক পুরনো হওয়ায় যাতায়াতের জন্য সামান্য যাত্রী সুবিধাও নেই বাসগুলোয়। অনেক বাসের বডিতে মরিচা ধরেছে। এসব বাসের সিট বেশ নড়বড়ে হয়ে গেছে। ইঞ্জিনের বিকট শব্দ ও কালো ধোঁয়া আশপাশের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করছে। এ ছাড়া, বাসের ভেতরে দুর্গন্ধ থাকায় অনেক কষ্টে চলাচল করে যাত্রী সাধারণ। বাসগুলোয় যে পরিমাণ যাত্রী ওঠানো হয়, তার চেয়ে অধিক মালামাল বহন করা হয়। এতে, মাঝেমধ্যেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার সৃষ্টি করে বাসগুলো।

নগরীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, কুড়িগ্রাম বাসস্ট্যান্ড ও সাতমাথা সুন্দরগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড ঘুরে বেশ কিছু ফিটনেসবিহীন বাস দেখা যায়। রংপুর বিআরটিএ থেকে জানা যায়, বাসগুলোর মধ্যে রংপুর-ব ০১-০০২৯ নম্বর বাসটি ১৯৭৭ সালে তৈরি হয়েছে। ১৯৭৮ সালে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার পর থেকে শাহ সুলতান নামের বাসটি চলছে রংপুর-ফুলবাড়ী রোডে। বাসটি দেখতে একদম নড়বড়ে হলেও এর রোড পারমিট রয়েছে ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। রংপুর-জ-১১-০০৩১ নম্বরের সুরভি পরিবহন নামের বাসটিও চলছে রংপুর-ফুলবাড়ী রোডে। ১৯৯৮ সালে তৈরির পর একই বছর রেজিস্ট্রেশন পেয়ে বর্তমান পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করছে বাসটি। রংপুর-জ ০৫-০০৫৮ নম্বরের বাসটি ১৯৮৮ সালে তৈরির পর একই বছর রেজিস্ট্রেশন করে রংপুর-দিনাজপুর রোডে চলাচল করে বাসটি। গত মাসে ফিটনেসহীন এ বাসটির ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদ শেষ হয়েছে। ২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল বাসটির রোড পারমিটের মেয়াদ শেষ হলেও তা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। রংপুর-জ ১১-০০৫৭ নম্বরের বাসটি ২০০২ সালে রেজিস্ট্রেশন পায়। গত বছরে বাসটির রোড পারমিটের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এর পরও ওই রোডে চলছে বাসটি। রংপুর থেকে বগুড়াগামী রংপুর-ব ১১-০০২ নম্বরের বাসটিরও রোড পারমিট শেষ হয়েছে। এর পরও চলছে হাড্ডিসর বাসটি। রংপুর-জ-০৫-০০২৫ নম্বরের কুড়িগ্রামগামী এ বাসটি তৈরি করা হয়েছে ১৯৭৫ সালে। আগামী মাসে এ বাসটির রোড পারমিট শেষ হবে। বাসটির বডি ও ইঞ্জিনের অবস্থা নাজুক হলেও তা চলছে ওই রোডে। রংপুর থেকে কুড়িগ্রামগামী রংপুর-জ-০৫-০০৬৫ নম্বরের বাসটিও তৈরি হয়েছে ১৯৭৫ সালে। ৩৩ বছর পরও সমানতালে বাসের ভেতরে যাত্রী ও ওপরে মালামাল নিয়ে যাতায়াত করছে বাসটি। বাসস্ট্যান্ডগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আন্তজেলায় চলাচলকারী বাসগুলোর তুলনায় রংপুর থেকে আন্তউপজেলায় চলাচলরত বাসগুলোর অবস্থা বেশি নাজুক। বিশেষ করে রংপুর থেকে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, নীলফামারীর ডোমার, ডিমলা, কুড়িগ্রামের উলিপুর, নাগেশ্বরীগামী বাসগুলোর অবস্থা একেবারেই বেগতিক। এসব বাসের ইঞ্জিন ভালো না থাকায় তেমন কন্ট্রোল করতে হিমসিম খায় চালকরা। এতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।

এ বিষয়ে জেলা মোটর মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আজিজুল ইসলাম রাজু বলেন, একটি বাস অনেক টাকায় কিনতে হয়। তাই সামান্য সমস্যা হলে মালিকরা ওই বাস বন্ধ রাখতে পারে না। বাসের লাইফ টাইমের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাসের সুনির্দিষ্ট কোনো লাইফ টাইম নেই। ইঞ্জিন বা বডি মেরামত করলে আবার নতুন হয়। তিনি আরো বলেন, ঢাকায় একটি বাস ২০ বছর চলার অনুমতি পায়। কিন্তু, ঢাকার বাইরে এ-সংক্রান্ত কোনো নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়নি।

রংপুর ট্রাফিক বিভাগের ইনচার্জ খান মো. মিজানুর ফাহামী বলেন, রেজিস্ট্রেশনহীন বাস আটক করে মামলা দেওয়া হচ্ছে। চলতি মাসের আট দিনেই ৪০টি বাসের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। রংপুর বিআরটিএর সহকারী পরিচালক আবদুল কুদ্দুস বলেন, ২০ বছরের পুরনো গাড়ি আন্তজেলায় চলাচল করতে পারবে না। আমরা ট্রাফিক বিভাগের সহযোগিতায় বিভিন্ন স্থানে গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। এ ছাড়া মালিকপক্ষকে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নবায়ন করার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

"