মাদারীপুরে ধ্বংসের পথে মৃৎশিল্প

বেকার হয়ে পড়ছে হাজারো পরিবার

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আব্দুল্লাহ আল মামুন, মাদারীপুর

মাদারীপুরে নানামুখী সমস্যার কারণে মৃৎশিল্প এখন ধ্বংসের পথে।

অনুকূল বাজারের অভাব, প্লাস্টিকজাত পণ্যে প্রভাব, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা না থাকা এবং মৃৎ সামগ্রী তৈরির উপযোগী মাটির অভাবে দিন দিন মৃৎশিল্প এই ধ্বংসের সম্মুখীন হচ্ছে বলে পেশাজীবী ও স্থানীয়দের মন্তব্য। ফলে পূর্বপুরুষের শত শত বছরের জীবিকা ছেড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়ছেন মৃৎশিল্পিরা। তবে এই শিল্প ধ্বংস হলে প্রায় ৫ হাজার পরিবার তাদের পেশা হারাবেন। তাই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানা যায়, মাদারীপুর জেলায় প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার পরিবার মৃৎশিল্পী পরিবারের বসত ছিল। মানুষ মাটির নিত্যদিনের সামগ্রী সানন্দে ব্যবহার করতেন। বর্তমানে মানুষ আর্টিফিশিয়াল সিরামিক, মেলামাইন বা অন্যান্য ধাতব তৈজসপত্র ব্যবহার করার ফলে মৃৎশিল্পের বাসন-কোসনের চাহিদাটা কমে যাচ্ছে। এই পেশা থেকে আয়করা বর্তমানে কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের বাজারজাতকরণের সেরকম কোনো সুবিদাও নেই। তারা অর্থনৈতিকভাবেও অনেকটা কষ্টে আছে। তবে তাদের কোনো ধরনের সহায়তাও প্রদান করা হয় না। তবে দেশের ঐতিহ্য হিসেবে এই শিল্পটাকে বাঁচিয়ে রাখা উচিত।

মাদারীপুর পৌরসভা লঞ্চঘাট সংলগ্ন দরগাহ শরীফ এলাকায় কুমার বাড়ি নামে একটি মহল্লা মৃৎশিল্পীর জন্য খুবই সুপরিচিত ছিল। এই এলাকায় মৃৎশিল্পী গোপাল পালের খুবেই সুনাম ছিলেন। এলাকার ২০টি পরিবার এই পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু মৃৎশিল্পের ধসের মুখে বিলুপ্তির পথে পেশা হারিয়েছেন অনেক পরিবার। এমনকি বেঁচেবর্তে ভালো থাকার আশায় গোপাল পালের পরিবারসহ প্রায় লোকজনই দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেছেন।

মাদারীপুর চৌরাস্তা রমেশ পালের বাড়ি প্রায় ২০০ বছরের সুপরিচিত এই মৃৎশিল্প। কিন্তু গত ৫ বছর ধরে তাদের বাড়িতে মৃৎশিল্পের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। রমেশ পালের স্ত্রী সন্ধা পাল (৬৫) বলেন, বর্তমানে ভালো মাটি পাওয়া যায় না। কাস্টমাররা প্লাস্টিক ও মেলামাইনের সামগ্রী কেনাকাটায় ঝুঁকে পড়েছে। ফলে আমদের এই পেশায় টিকে থাকা খুবেই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আমার ২ ছেলে এখন এই পেশা ছেড়ে স্বর্ণের দোকানে কাজ করে সংসার চালাচ্ছে। একই কথা বলেন কুমারপাড়ার মরন পোদ্দার (৪২) ও মাহাজন সুজন পাল (৪০) এবং পালপাড়ার জ্যোদিশ পাল (৬৫) ও শ্যামল পাল (৬৩)।

জেলার কালকিনি উপজেলার পৌরসভা ৪নং ওয়ার্ডের চরবিভাগদী গ্রামের কুমার বাড়ীর অনিল পোদ্দার (৮৩) ও সুজিৎ পাল (৭০) এবং নিখিল পাল (৪৫) বলেন, কালকিনি উপজেলায় পালপাড়া ২৫০ বছরের পুরনো এই ঐতিহ্য। এই পাড়ায় এক সময় ৭০০ থেকে ১০০০ পরিবার মৃৎশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। বর্তমানে ২০০ থেকে ২৫০টি পরিবার এ পেশায় ঝুঁকে আছে। অনেকেই নিজ পরিবার নিয়ে ভারতে চলে গেছে, আবার কেউ এ পেশার পাশাপাশি খেতে খামারে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। একই কথা বলেন কুমার পাড়ার মরন পোদ্দার (৪২) ও মাহাজন সুজন পাল (৪০)।

রিকতা পাল (৪৮) নামে এক নারী মৃৎশিল্পী বলেন, আমি গত ১৫ বছর ধরে মাটিরকুমির, হাতি, ঘোড়া, ড্রাগন তৈরি করছি। আমার এই মৃৎশিল্প বিদেশে রফতানি করা হচ্ছে। এমনকি ঢাকাতে জুটয়াক, আড়ং মার্কেটসহ বিভিন্ন বড় বড় শপিংমলে পাইকারি বিক্রয় করছি। এসব পণ্য শোপিচ হিসেবে বিক্রি হয়। আমাদের পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় ক্রেতাদের চাহিদামতো পণ্য দিতে পারছি না। তবে সরকার যদি আমাদের আর্থিক সহায়তা ও ঋণ দেয়, তাহলে এই কাজ করে আমরা সরকারের টাকা পরিশোধ করে এই শিল্পটি বাঁচিয়ে রেখে লাভবান হতে পারব।

মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার খালিয়া গ্রামের আনন্দ পাল, অশোকপাল, অনন্তপাল, বাদল পাল ও গনেশ পাল বলেন, এক সময় রাজৈর উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে মৃৎশিল্পে সমৃদ্ধ ছিল ব্যাপক। ব্রিটিশ আমল থেকেই মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য এই পালপাড়া। এই গ্রামে ২০০টি পরিবার এ পেশায় কাজ করতেন। কাজের চাহিদা না থাকার কারণে বর্তমানে ৫০টি পরিবার কাজ করে কোনো রকম দিন কাটাচ্ছে। তারা বলেন, বৈশাখ ও জৈষ্ঠ্য মাসে মাটির কলস ও শীতের মৌসুমে খেজুরের রশের হাড়ি একটু বেশি বিক্রি হলেও বছরের বাকি দিনগুলো কর্মহীন হয়ে কোনো রকম দিন কাটাতে হয়।

এ বিষয়ে মাদারীপুর জেলা প্রশাসক ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, মৃৎশিল্পীদের আধুনিক শোপিচ, তৈজসপত্র যদি জেলার বাইরে বাজারজাত করা যায়, তাহলে হয়তো এ শিল্পটাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। তবে এ বিষয়ে সমস্যার কথা নিয়ে তারা আমাদের কাছে কখনো আসেননি। তিনি আরো বলেন, সরকার যেহেতু চাচ্ছে দেশে কোনো মানুষ কর্মহীন থাকবে না, শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকবে না, কোনো মানুষ বেকার থাকবে না, বিদ্যুৎহীন থাকবে না, চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকবে না। তাদের এসব মানবিক সমস্যা যদি থাকে তারা যদি প্রয়োজন মনে করে, তাহলে অবশ্যই আমরা দেখব এবং তার পাশাপাশি আমরা তাদের আরো কোনো দাবি-দাওয়া যদি থাকে তাহলে সরকারের কাছে আমরা উপস্থাপন করব।

"