এসএসসি পাস করেই মা ও শিশুরোগ অভিজ্ঞ!

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

রাকিবুল ইসলাম রাকিব, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ)

নাম তার মিলিকা জাহান আঁখি। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস। ল্যাব টেকনিশিয়ান সহকারী হিসেবে রোগীর শরীর থেকে রক্ত, কফ, মলমূত্র এবং শরীরের বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহের কাজ করতেন তিনি। তবে গত কয়েক মাস আগে থেকে নিজের এই পরিচয় বদলে ফেলেছেন আঁখি। এখন তার নাম ডা. মিলিকা জাহান আঁখি। নামের শেষে লেখেন মা ও শিশু রোগ অভিজ্ঞসহ নানা বিশেষণ। স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারণা শুরু করে মা ও শিশু রোগ অভিজ্ঞ ‘ডাক্তার’ পরিচয় দিয়ে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা ও পৌর শহরের বিভিন্ন স্থানে প্রাইভেট চেম্বার খুলে রোগী দেখেন। আর এসব প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে অনেকই অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছেন। পকেট থেকে গচ্ছা দিচ্ছেন নগদ টাকা। তার এসব কর্মকান্ডে প্রকৃত চিকিৎসকদের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে বলে অভিযোগ সচেতন মহলের।

বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন ২০১০ এর ২৯ উপধারা (১) অনুযায়ী ন্যূন্যতম এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রি প্রাপ্তগণ ব্যতীত অন্য কেউ তাহাদের নামের পূর্বে ‘ডাক্তার’ পদবী ব্যবহার করিতে পারবে না। এর বিধান লঙ্ঘন করলে তিনি তিন বছর কারাদ- বা এক লাখ টাকা অর্থদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত হবেন।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, টেকনিশিয়ানের সহকারী থেকে হুট করেই মা ও শিশু রোগে অভিজ্ঞ ‘ডাক্তার’ বনে যাওয়া আঁখির বিরুদ্ধে এখনো কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না স্থানীয় প্রশাসন। তবে আঁখির দাবি, সে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৪ সালে এসএসসি পাস করে জেলা শহরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে এক বছর মেয়াদি টেকনোলজিস্ট কোর্স ও এক বছর মেয়াদি প্যারামেডিকেল কোর্স সম্পন্ন করেছেন। পরবর্তীতে কিশোরগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতাল ও গৌরীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ইন্টার্নশিপ করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, প্যারামেডিকেল কোর্সধারীদের নামের আগে ‘ডাক্তার’ পদবী ব্যবহার করা দ-নীয় অপরাধ। এই কোর্সধারীরা প্রাথমিক চিকিৎসার ৪০-৪৫টি ওষুধ ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লিখতে পারবে না। আর আঁখি আমাদের এখানে ইন্টার্নশিপ করেনি। তার বিরুদ্ধে যেনো দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয় সে জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করব। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আঁখির বাড়ি গৌরীপুর উপজেলার পশ্চিম দাপুনিয়া গ্রামে। তার বাবার নাম মৃত দুলাল উদ্দিন। একসময় জেলা শহরের বিভিন্ন ক্লিনিক ও প্রাইভেট হাসপাতালে সেবিকার কাজ করলেও ২০১৪ সালের দিকে জেলা শহর ছেড়ে গৌরীপুর পৌর শহরের কালীপুর মধ্যম তরফ এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মো. গিয়াস উদ্দিনের প্রাইভেট চেম্বারে ল্যাব টেকনিশয়ানের সহকারী হিসেবে চাকরি নেয় আঁখি। সেখানে কয়েক বছর চাকরি করার পর পৌর শহরের ডিজিটাল ডায়গনোস্টিক সেন্টারে একই পদে চাকরি নেন।

তবে গত শনিবার প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার মাহবুব আলম বলেন, আঁখি এখানে টেকনিশিয়ানের সহকারী হিসাবে কাজ করত। তবে গত ঈদের পর থেকে কর্মস্থলে আসছে না। শুনেছি সে বাইরে রোগী দেখে।

অপরদিকে ডা. মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, ৩-৪ বছর আগে আমার চেম্বারে টেকনিশিয়ানের সহকারী হিসেবে কাজ করত আঁখি। ওই সময় তার কোনো পড়ালেখা ছিল না। এখন কোনো ট্রেনিং নিয়েছে কি না, আমার জানা নেই। আর সে নামের আগে কীভাবে ‘ডাক্তার’ পদবী ব্যবহার করছে বিষয়টি আমার বোধগম্য নয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারণা শুরু করে মা ও শিশু রোগ অভিজ্ঞ ‘ডাক্তার’ পরিচয় দিয়ে উপজেলার পাছার, শাহগঞ্জ, পালোহাটি, পশ্চিম দাপুনিয়া, মুখোরিয়াসহ ইউনিয়নেয়র বিভিন্ন বাজারে প্রাইভেট চেম্বার খোলে রোগী দেখছেন প্যারামেডিকেল কোর্সধারী দাবিদার আঁখি। নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধির কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে এন্টিবায়েটিকসহ তৃতীয় প্রজন্মের উচ্চমাত্রার ওষুধ দিয়ে রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে আঁখির কাছে চিকিৎসাসেবা নেওয়া রোগীদের তিনটি ব্যবস্থাপত্র প্রতিদিনের সংবাদের এ প্রতিনিধির কাছে এসেছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের যোগাযোগে করে ওই তিনটি ব্যবস্থাপত্রে এন্টিবায়েটিকসহ তৃতীয় প্রজন্মের ‘সেফালোস্পোরিন’ গ্রুপের ওষুধ লেখার সত্যতাও পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয় অর্থের বিনিময়ে অবৈধ গর্ভপাত করানোর অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মিলিকা জাহান আঁখি বলেন, কিছু বিক্রয় প্রতিনিধির ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে না লেখার কারণে তারা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। নামের আগে ‘ডাক্তার’ লেখা বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি ভুল হয়ে গেছে। অন্যদের দেখাদেখি লিখেছিলাম। এখন ‘ডাক্তার’ লেখা সাইনবোর্ডও নামিয়ে ফেলব। ব্যবস্থাপত্র থেকেও নামের আগে ‘ডাক্তার’ লেখা পদবী সরিয়ে ফেলব। আর আমি গর্ভপাত করাই এই অভিযোগ সত্য নয়। এ সময় তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও চিকিৎসার সনদ দেখতে চাইলে তিনি চিকিৎসা বিদ্যার একটি সনদ ছাড়া অন্য কোনো সনদ দেখাতে পারেনি। উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ফারহানা করিম বলেন, আঁখির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

"