প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই বেড়ার নগরবাড়ী নৌবন্দরে

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আরিফ খান, বেড়া (পাবনা)

পাবনার বেড়া উপজেলার নগরবাড়ী নৌবন্দরে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। এখানে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার টন পণ্যসামগ্রী নিয়ে সাত থেকে আটটি কার্গো জাহাজ ভিড়ছে। এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টন বিভিন্ন পণ্য আমদানি-রফতানি করা হয়। বন্দর এলাকায় পণ্যসামগ্রী রাখার জন্য নেই কোনো বাফার গুদাম। নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার টন রাসায়নিক সার। নৌবন্দরে আমদানি-রফতানি বেড়ে যাওয়ায় নগরবাড়ীর স্থবির হয়ে পড়া ব্যবসায়-বাণিজ্য আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। শ্রমিকদের হাঁকডাকে মুখরিত হয়ে উঠেছে বন্দর এলাকা।

সরেজমিন নগরবাড়ী ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৬৪ সালে নগরবাড়ী-আরিচা রুটে ফেরি চলাচল শুরু হওয়ার পর থেকেই নগরবাড়ী বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। এ ছাড়া উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রবেশ দ্বার হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। প্রতিদিন নগরবাড়ী হয়ে দুই শতাধিক যাত্রবাহী কোচ ও তিন শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহন রাজধানী ঢাকাসহ পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করত। আবার প্রতিদিন যাত্রী ও পণ্য নিয়ে সমান সংখ্যক বাস-ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহন আরিচা হয়ে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে আসত। নগরবাড়ীতে ফেরির অপেক্ষায় শত শত যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত। ফেরি সার্ভিসকে কেন্দ্র করে নগরবাড়ীতে গড়ে ওঠে শতাধিক আবাসিক হোটেল, খাবার হোটেল, রেস্টুরেন্ট, পান-বিড়ির দোকান। দোকান কর্মচারী, শ্রমিক, হকার ও হাজারো যাত্রীর পদচারণায় নগরবাড়ী উৎসবমূখর থাকত। এতে এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়। ১৯৯৭ সালে যমুনা সেতু চালুর পর নগরবাড়ী-পাটুরিয়া রুটে ফেরি সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়া হয়। নগরবাড়ীর ব্যবসায়-বাণিজ্যে নেমে আসে নীরবতা।

জানা যায়, ২০০৩ সাল থেকে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার টন রাসায়নিক সার, ক্লিংকার, কয়লা, গমসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী সাত থেকে আটটি কার্গোজাহাজ নগরবাড়ী বন্দরে ভিড়ছে। পণ্যসামগ্রী লোড-আনলোডে শত শত শ্রমিকের হাঁকডাকে নগরবাড়ী ঘাট এলাকা মুখরিত হয়ে উঠেছে। নগরবাড়ী নৌবন্দরে নেই জাহাজ ভেড়ার পল্টুন, ডকইয়ার্ড, ক্রেন ও পণ্যসামগ্রী রাখার গুদাম। বিভিন্ন পণ্যবাহী জাহাজ এসে নগরবাড়ীতে ঝুঁকি নিয়ে যমুনা নদীর পাড়ে ভিড়ছে। প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ শ্রমিক প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জাহাজ থেকে মালামাল লোড-আনলোড করছে। পন্টুন না থাকায় ৮-৯ ফুট উঁচু থেকে বস্তা মাথায় নিয়ে সিড়ি বেয়ে তাদের নদীর পাড়ে নামতে হচ্ছে। সম্প্রতি একজন শ্রমিক সিড়ি দিয়ে নামার সময় নিচে পড়ে বস্তা চাপায় মারা যায়। বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী জাহাজ থেকে আনলোড করে খোলা আকাশের নিচে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। সেখানে বাফার গুদাম না থাকায় প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে হাজার হাজার টন রাসায়নিক সার মাসের পর মাস খোলা আকাশের নিচে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে জমাট বেঁধে যাচ্ছে। এতে ওই সারের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সারের ঝাঁঝাল গন্ধে আশেপাশের এলাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নগরবাড়ীর ব্যবসায়ীরা পণ্যবাহী জাহাজ ভিড়ার পন্টুন, ডকইয়ার্ড, ক্রেন ও বাফার গুদাম নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন দীর্ঘদিন। কিন্তু তাদের সে দাবি পূরণ হয়নি।

নগরবাড়ীর ব্যবসায়ীরা জানান, ১৯৯৭ সালের আগে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান নগরবাড়ী বন্দর ফেরিঘাট দিয়ে প্রতিদিন শতাধিক যাত্রীবাহী কোচ, প্রায় দুই শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহন পারাপার হতো। যমুনা সেতুর চেয়ে স্বল্প খরচে ও সময়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য ও কাঁচামালবাহী এসব ট্রাক নগরবাড়ী ঘাট হয়ে রাজধানীর ঢাকার উদ্দেশে পাড়ি দিত। আবার পাটুরিয়া থেকে একইভাবে যানবাহন আসত। এতে যাত্রাপথের দূরত্ব কম হওয়ায় জ্বালানি খরচ অনেক সাশ্রয় হতো। উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান নগরবাড়ীর কাজিরহাট-পাটুরিয়া রুটে ফেরি চলাচল না করায় পাবনাসহ উত্তরাঞ্চলে মালবাহী ট্রাক চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

মানিকগঞ্জ জেলার ট্রাক চালক আজিবর রহমান জানান, যমুনা সেতু হওয়ার পর প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ ঘুরে উত্তরাঞ্চলে আসতে হয়। এতে সময় ও জ্বালানি খরচ বেশি লাগে। অনেক সময় জ্যামে আটকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। অন্যদিকে নগরবাড়ী ফেরি ঘাট হয়ে রাজধানীতে যেতে তেল খরচ ও সময় অনেক কম লাগে। যাত্রাপথের দূরত্বও কম হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরো জানায়, ১৯৬৪ সালে নগরবাড়ী-আরিচা রুটের ফেরি চলাচল শুরু হওয়ার পর থেকেই নগরবাড়ী উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। আশির দশকের শেষ দিক থেকে এই রুটে তিন তলা রো রো ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়। ১৯৯৭ সালে যমুনা সেতু চালুর আগ পর্যন্ত প্রতিদিন এই রুটে চলাচল করত সাত থেকে আটটি রো-রো ফেরি। যমুনা সেতু চালুর পর নগরবাড়ী-পাটুরিয়া নৌরুটে ৩-৪টি রো-রো ফেরি চলাচল করত। উত্তরাঞ্চলের অন্যতম নৌবন্দর নগরবাড়ী-পাটুরিয়া রুটে ২০০৭ সালের মাঝামাঝিতে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সেই থেকে এই রুটে ফেরি চলাচল একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। ফেরি সার্ভিস চালু হলে উত্তরাঞ্চল-ঢাকা মহাসড়কে যানজট ও যাত্রীসাধারণের ভোগান্তি বহুলাংশে কমে আসবে। যমুনা সেতুতে চাপ কমবে।

ব্যবসায়ী ও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দাবি, নগরবাড়ী নৌবন্দরে পন্টুুন, ডকইয়ার্ড, ক্রেন স্থাপন, বাফারগুদাম নির্মাণসহ নগরবাড়ীর কাজিরহাট-পাটুরিয়া রুটে ফেরি সার্ভিস চালু করা হলে এ অঞ্চলের ব্যবসায়-বাণিজ্যে আরো প্রসার হবে। অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন এ অঞ্চলের কৃষক, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের মানুষ।

 

"