ফুলবাড়িয়ায় কেঁচো সার উৎপাদন

বাড়তি আয় করছেন নারীরা

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

হেলাল উদ্দিন উজ্বল, ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ)

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ঘনবসতি একটি ছোট্ট গ্রাম নাটুয়াপাড়া। গ্রামে পরিবারের সংখ্যা মাত্র ১২০টি, এর বেশির ভাগই দরিদ্র। কোনো কোনো পরিবার একেবারেই হতদরিদ্র, দিন আনে দিন খায়। দারিদ্র্য দূরীকরণে স্বপ্ন দেখেন গ্রামের ৫ জন নারী। মিনারা বেগম, শিল্পি বেগম, সাজেদা খাতুন, আমেনা খাতুন ও মর্জিনা খাতুন। ২০১৬ সালে ওয়ার্ল্ড ভিশনের সহায়তায় কেঁচো সার উৎপাদনে ৩ দিনের প্রশিক্ষণ নেন তারা। প্রশিক্ষণ শেষে আলাদা আলাদা চাড়িতে ২০টি কেঁচো দিয়ে কম্পোস্ট সার উৎপাদন শুরু করেন। প্রত্যেকের এখন ৬ থেকে ১০টি কেঁচো সার উৎপাদনের চাড়ি রয়েছে। তাদের দেখে একই বছর গ্রামের আরো ২০ জন নারী ওয়ার্ল্ড ভিশনে প্রশিক্ষণ নিয়ে কেঁচো কম্পোস্ট সার উৎপাদন শুরু করেন। পারিবারিক বাধা, কুসংস্কার ও সামাজিক অবহেলার শিকারসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে তারা আজ বাড়তি আয় করে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে। গ্রামের ৮০টি পরিবার এখন কেঁচো সার উৎপাদন করছেন। নাটুয়াপাড়া গ্রামটি এখন ‘কেঁচো সারের গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করছে।

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার কুশমাইল ইউনিয়নে শিবগঞ্জ সড়কে উত্তর পাশে নাটুয়াপাড়া গ্রাম। সড়কের পাশেই একটি গাছে সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে ‘এই গ্রামে কেঁচো সার পাওয়া যায়’। সাইনবোর্ড দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির আশা। কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরিতে মূলত নারীরাই দেখভাল করেন। এ গ্রামের নারীদের দেখে এখন অন্য গ্রামের নারীরা উদ্বুদ্ধ হয়ে কেঁচো সার উৎপাদন করছেন। কম্পোস্ট সার উৎপাদনে কেঁচো ও গোবরের প্রয়োজন পরে। কেঁচোর পরিমাণের ওপর নির্ভর করে দ্রুত সার উৎপাদন। সার উৎপাদনে ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগে। সরকার বা কোনো বেসরকারি এনজিও বাণিজ্যিকভাবে যদি কেঁচো সার বাজারজাত করার উদ্যোগ নেয় তাহলে কেঁচো সার উৎপাদন বাড়বে এবং জমিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার অনেকটা কমে আসবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

নাটুয়াপাড়া গ্রামটিতে প্রায় প্রতিটি পরিবার নিজ ঘরের পাশে চাড়ি ও বালতিতে কেঁচো সার উৎপাদন করছেন। প্রতি মাসে কমপক্ষে ৪ টন কেঁচো সার উৎপাদন করছে এ গ্রামের নারীরা। ৮ থেকে ১০ টাকা কেজি দরে কেঁচো সার বিক্রি করলেও কেঁচো বিক্রি করছেন ২ হাজার টাকা কেজি দরে।

নাটুয়াপাড়া গ্রামে কম্পোস্ট সার উৎপাদন দেখে আশেপাশের গ্রামের অনেকই কেঁচো দিয়ে কম্পোস্ট সার উৎপাদন করে নিজেদের কৃষিজমিতে ব্যবহার করছেন। কেঁচো সার উৎপাদনের তুলনায় বাজারজাত করতে পারছে না এ গ্রামের নারীরা। আশেপাশের কৃষক ও ফিসারির মালিকদের কাছে ৮ টাকা থেকে ১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে থাকেন। কেঁচো দিয়ে উৎপাদিত ভার্মি কম্পোস্ট সার পাইকারি বাজারজাত করতে পারলে এ গ্রামে প্রতি মাসে কমপক্ষে ৯ থেকে ১০ টন উৎপাদন করা সম্ভব বলে মনে করেন গ্রামের নারীরা। বাকতা বাজারের আনোয়ার হোসেন নামের একজন ব্যবসায়ী মাসে একবার, এমনকি ২ মাসে একবার নাটুয়াপাড়া গিয়ে পাইকারি দরে কেঁচো সার ক্রয় করে নিয়ে আসেন বলে জানান।

নাটুয়াপাড়াসহ আশেপাশের গ্রামগুলোতে রাসায়নিক সারের চেয়ে কেঁচো কম্পোস্ট সার জমিতে ব্যবহার বাড়ছে। এতে করে জমিতে যেমন ফলন বাড়ছে, তেমনি রাসায়নিকসার মুক্ত ফসল ও শাকসবজি উৎপাদন হচ্ছে।

কেঁচো সার উৎপাদনকারী সাজেদা খাতুন বলেন, দরিদ্র পরিবার আমাদের, এক সময় সংসার ও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া খরচ জোগানো ভ্যানচালক স্বামীর ওপর নির্ভর ছিল। এখন খরচবিহীন কেঁচো কম্পোস্ট সার বিক্রি করে বাড়তি আয় করছি এবং ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচসহ সুন্দর ভাবে সংসার চলছে।

শাহিনা আক্তার নামের আরেকজন বলেন, নিজের উৎপাদিত কেঁচো সার দিয়ে ৪ কাঠা জমিতে ধান আবাদ করেছিলাম। অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি ধান হয়েছে। এ ছাড়াও বাড়ির আঙিনায় মৌসুম অনুযায়ী সবজি চাষ করছি। সবজি গাছে কেঁচো সার ব্যবহার করায় প্রচুর ফলন হয়। সবজি বিক্রি করে ও ৬টি চাড়িতে প্রতি মাসে উৎপাদিত ১৮০ থেকে ২০০ কেজি কেঁচো সার বিক্রি করে বাড়তি আয় হচ্ছে সংসারে।

কুশমাইল ইউপি চেয়ারম্যান শামছুল হক বলেন, এক সময় কৃষিজমির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হয়েছে জৈব সার। এখন অধিক মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে জমির উর্বরতা ও খাবারের স্বাদ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

কৃষিবিদ মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম বলেন, ভার্মি সারে পরিবেশের ওপর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে না। বিষমুক্ত সবজিসহ সার ও কেঁচো বিক্রি করে সংসারে বাড়তি আয়সহ পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করছে। বিকল্প কাজের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় পরিবারে নারীদের ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে।

ফুলবাড়িয়া এপি ম্যানেজার বলেন, গ্রামের দরিদ্র পরিবারের নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যম তৈরি কারাই এপির মূল লক্ষ্য। উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে প্রায় ৩০০ দরিদ্র পরিবারের নারীদের কেঁচো সার উৎপাদনে প্রশিক্ষণসহ উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। তারা এখন নির্ভেজাল সবজি উৎপাদন করে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটানোসহ কেঁচো সার বিক্রি করে শিশুদের লেখাপড়ার পাশাপাশি সংসারে বাড়তি আয় করছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. নাসরিন আক্তার বানু বলেন, কেঁচো সার ব্যবহারে জমির উর্বর শক্তি ও জৈব পদার্থ বাড়বে। জমিতে ফসল ভালো হবে, খাদ্যের স্বাদ থাকবে ভিন্ন। উপজেলায় ভার্মি (কেঁচো কম্পোস্ট) সার উৎপাদন দিন দিন বাড়ছে। যারা কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরি করছে তারা যদি প্যাকেটজাত করতে চান তাহলে তার ব্যবস্থা করে দিব।

"