অর্থ সংকটে রংপুরের চামড়া ব্যবসায়ীরা

ঈদে চামড়ার বাজারে ধসের আশঙ্কা : সরকারিভাবে ব্যাংকঋণ না দেওয়ায় দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

আব্দুর রহমান রাসেল, রংপুর

ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে থেকে পাওনা টাকা আদায় করতে না পারা এবং লোকসানের কারণে চরম অর্থ সংকটে পড়েছে রংপুর বিভাগের চামড়া ব্যবসায়ীরা। রংপুর বিভাগের আট জেলার ছোট-বড় মিলে প্রায় দুই হাজার চামড়া ব্যবসায়ীর পাওনা প্রায় ১৫০ কোটি টাকা আদায় করতে না পারায় তারা এই সংকটে পড়েছেন। এ নিয়ে ট্যানারি মালিকদের দফায় দফায় চাপ দেওয়ার পরও টাকা পরিশোধ করছেন না তাদের অভিযোগ। অর্থ সংগ্রহ করতে না পারলে এবার কোরবানি ঈদে চামড়ার বাজারে ধস নামার আশঙ্কা করছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ভারতীয় মাড়োয়ারীরা রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের সীমান্ত এলাকায় অবস্থান নিয়ে এ দেশের ফড়িয়া দালালদের হাতে কোটি কোটি টাকা তুলে দিচ্ছেন তাদের দাবি। পাশাপাশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে পাচারকারী দলের সদস্যরাও। রংপুর, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়সহ সীমান্ত জেলা দিয়ে এবার ছাগলের চামড়ার পাশাপাশি গরুর চামড়া পাচারের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

তবে পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য্য জানান, চামড়া পাচার রোধে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কোনো অবস্থায় রংপুর বিভাগের সীমান্ত দিয়ে কোনো চামড়া পাচার করতে দেওয়া হবে না।

রংপুর চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতি সূত্রে জানা যায়, রংপুর বিভাগের আট জেলার ছোট-বড় মিলে চামড়া ব্যবসায়ীর সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। এর মধ্যে রংপুর জেলায় চামড়া ব্যবসায়ী রয়েছেন প্রায় ৩০০। এদের মধ্যে আড়তদার রয়েছেন প্রায় ১০০ জন। ঢাকার ট্যানারি মালিক ও নাটোরের আড়তদারদের কাছে রংপুর বিভাগের চামড়া ব্যবসায়ীর বকেয়া পাওনা রয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। রংপুর জেলার চামড়া ব্যবসায়ীদের পাওনা রয়েছে ৪০ কোটি ৩০ লাখ টাকা। কিন্তু পরবর্তীতে ঋণ খেলাপির দায়ে কিছু কিছু দেনাদার ট্যানারি বন্ধ হয়ে যায়। এই বকেয়া পাওনা আদায়ে দফায় দফায় চাপ দেওয়া হলেও টাকা পরিশোধের ব্যাপারে তাদের কোনো আগ্রহ নেই বলে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে চামড়া ব্যবসায়ী। তারা আরো জানান, ছোট ব্যবসায়ী ও ফড়িয়া দালালদের কাছ থেকে চামড়া কিনে বড় বড় ব্যবসায়ীরা ঢাকার বিভিন্ন ট্যানারিতে সরবরাহ করে থাকেন। কিন্তু এবারে আর্থিক সংকটের কারণে বড় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ছোট ব্যবসায়ী ও ফড়িয়া দালালরাও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। আর এই সুযোগে ভারতীয় মাড়োয়ারীরা রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের সীমান্ত এলাকায় অবস্থান নিয়ে এ দেশের ফড়িয়া দালালদের হাতে কোটি কোটি টাকা তুলে দিয়েছে বলে জানা যায়। পুঁজি সংকটের কারণে প্রায় ২০০ ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন। ৬০টি চামড়ার আড়তে এখন অটো বাইকের শোরুম করা হয়েছে। ঢাকার ট্যানারি মালিকরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চামড়ার দাম কমিয়ে ভারতে চামড়া পাচারের সুযোগ করে দিয়েছেন। এ অবস্থায় চামড়া শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ব্যবসায়ীরা সুদ দেওয়ার শর্তে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছেন।

চামড়া ব্যবসায়ী হারুন অর রশীদ জানান, চামড়া ব্যবসায় অব্যাহত লোকসানের কারণে আমি সর্বশান্ত হয়ে পড়েছি। এ কারণে চামড়া ব্যবসা বাদ দিয়ে পরবর্তীতে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার ব্যবসা শুরু করেছি। চামড়া ব্যবসায় অব্যাহত লোকসানে পড়ে বেশির ভাগ চামড়া ব্যবসায়ী চামড়া ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে রিকশা চালানো থেকে শুরু করে শ্রমিকের কাজ করছেন। আবার অনেকেই ব্যাংক ঋণ নিয়ে চামড়া ব্যবসা বাদ দিয়ে অটো রিকশার ব্যবসা শুরু করেছেন। তিনি জানান, এই চামড়া ব্যবসায় লোকসানের কারণে বর্তমানে চামড়ার মোকাম শাপলা চত্বরের চামড়া পট্টিতে আগে যেখানে ১০০ থেকে ১৫০ ব্যবসায়ী ছিল সেখানে ১০-১২ জন ব্যবসায়ী টিকে আছেন।

রংপুর জেলা হাজীপাড়া ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মহসিন আলম জানান, পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকলেও এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে ব্যাংক ঋণ দেওয়া হয়নি। কোরবানির পরে ট্যানারি মালিকরা সিন্ডিকেট করে এ দামও কমিয়ে দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে এবং আমাদের সর্বশান্তের ষড়যন্ত্র করছে। এ ব্যাপারে তিনি দ্রুত সরকারকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান।

 

"