অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ : ইসলামপুরে টিআর-কাবিখার ২৫৭ প্রকল্প

কাগজেকলমে সম্পন্ন অধিকাংশ প্রকল্প, বাস্তবে কাজ হয়নি

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

মঞ্জুরুল হক, জামালপুর

জামালপুরের ইসলামপুরে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির আওতায় টিআর এবং কাবিখা কর্মসূচির ২৫৭টি প্রকল্পের অধিকাংশই শুধুমাত্র কাগজেকলমে শতভাগ বাস্তবায়ন দেখানো হয়েছে। এতে ১ কোটি ৯৪ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং ১৪৭ টন চালের সিংহভাগ হরিলুট হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

অভিযোগকারীদের অনেকেই জানান, স্থানীয় এমপি ফরিদুল হক খানের অনুমোদিত তালিকার এইসব প্রকল্পের অর্থ তার স্থানীয় আস্থাভাজন দলীয় নেতাকর্মীরা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছেন। ইসলামপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার নির্দেশে তার কার্যালয়ে কর্মরত ইজিপিপি প্রকল্পের সুপারভাইজার মমিনুল ইসলাম ইজিপিপি প্রকল্পসহ ইসলামপুরের প্রতিটি টিআর ও কাবিখা প্রকল্পের সভাপতির নিকট প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য মোটা অঙ্কের বিশেষ সুবিধা আদায় করেন। তিনিই ওইসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ভুয়া সরেজমিন প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। এতে বিভিন্ন ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারের যোগসাজশও আছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জামালপুর-২ ইসলামপুর আসনের এমপি ফরিদুল হক খানের কোটায় টিআর কর্মসূচির আওতায় প্রথম পর্যায়ে ৭২টি প্রকল্পের বিপরীতে সরকার ৪৮ লাখ ৬৯ হাজার ২০৩ টাকা ও কাবিটার প্রথম পর্যায়ে ১৮ প্রকল্পে ৫৭ লাখ ৬২ হাজার ৯৯৮ টাকা বরাদ্দ দেয়। একই অর্থবছরে দ্বিতীয় পর্যায়ে টিআর কর্মসূচির আওতায় ১০৫ প্রকল্পের জন্য ৪৮ লাখ ৬৯ হাজার ২০৩ টাকা ও কাবিখার ১২ প্রকল্পের জন্য ১৪৭.৩৮৬ টন চাল বরাদ্দ দেয় সরকার। এ ছাড়া একই বছরে বিশেষ বরাদ্দে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ টিআর কর্মসূচির ৫০টি প্রকল্পের বিপরীতে ৩৯ লাখ ১০ হাজার ১৩৪ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি প্রকল্প এলাকার শুরু ও শেষে প্রকল্পের বিবরণী, কমিটি সম্পর্কিত তথ্য দিয়ে সাইনবোর্ড থাকার কথা অথচ ইসলামপুরের কোথাও এ সংক্রান্ত সাইনবোর্র্ড লাগানো হয়নি। তাই প্রকল্প বরাদ্দ ও কারা কমিটির সভাপতি-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন তা জানা ছিল না এলাকাবাসীর।

ইসলামপুর সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলাম মঞ্জুসহ স্থানীয় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী গত ৫ আগস্ট জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। এর অনুলিপি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসেও পাঠানো হয়। এতে জানা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে টিআর এবং কাবিখা কর্মসূচির আওতায় প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে সদর ইউনিয়নে ১৪ প্রকল্পে মোট ২৬ লক্ষাধিক টাকা এবং ৪৭.৪২৩ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু এসব প্রকল্পের কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি অথচ কাগজেকলমে সব প্রকল্পই শতভাগ বাস্তবায়ন দেখিয়ে সব টাকা তুলে নিয়েছেন সদর ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান চৌধুরী শাহীন ও প্রকল্প কমিটির লোকজন। অভিযোগ সূত্রে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইসলামপুর সদর ইউনিয়নে কাবিটা ১১নং প্রকল্পে পচাবহলা ডিসিসিআর রাস্তা সংলগ্ন খালেকের বাড়ি থেকে বারেকের বাড়ি পর্যন্ত এবং ১২নং প্রকল্পে পাঁচবাড়িয়া মরহুম আসাদুজ্জামানের বাড়ি থেকে কাচিহারা ঈদগাহ্ মাঠ পর্যন্ত রাস্তা মেরামতে কোনো প্রকার কাজ করা হয়নি। অথচ কাগজেকলমে বলা হচ্ছে ‘বাস্তবায়ন হয়েছে’। এ ছাড়া টিআর ও কাবিখার প্রল্পের আওতায় কাচিহারা ঈদগাহ্ মাঠ ও কাচিহারা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠ মাটি ভরাট দেখিয়ে ৩ লাখ টাকা এবং ১০ টন চাল উত্তোলন করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে প্রকল্প দুইটিতে কোনো প্রকার সংস্কার কাজ হয়নি। সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, সদর ইউনিয়নের অতি দরিদ্রদের কর্মসংস্থানের জন্য ৪০ দিনের ছয়টি ইজিপিপি প্রকল্পের কোনো প্রকার কাজ না করে ২১২ জন শ্রমিকের ৪০ দিনের মজুরির প্রায় ৯ লাখ টাকার পুরোটাই আত্মসাৎ করা হয়েছে। একইভাবে পচাবহলা পাকা রাস্তার পাশে হালিমের দোকান থেকে খোরশেদের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামতের ১২ টন চাল, পচাবহলা জামেদ আলী দাখিল মাদ্রাসা থেকে লেবু মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামতের ৪০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হলেও কোনো রকম কাজ করা হয়নি।

এদিকে কাবিটা কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায়ে ১নং প্রকল্পে ১৬ টন চাল বরাদ্দে কুলকান্দি হার্ড পয়েন্ট থেকে পাথর্শী সীমানা পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণ, ১০ টন চাল বরাদ্দে ইসলামপুর গুঠাইল পাকা রাস্তা থেকে ফৈলামারী ঈদগাহ্ মাঠ পর্যন্ত রাস্তা উন্নয়ন, একই পরিমাণ চাল বরাদ্দে ইসলামপুর নেকজাহান মডেল হাইস্কুলের মাঠ উন্নয়ন ও ইসলামপুর উত্তর দরিয়াবাদ গোরস্থান উন্নয়নের নামে ২৫ টন উত্তোলন করা হলেও কোনো রকম কাজ করা হয়নি।

ইসলামপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার মেহেদী হাসান টিটু বলেন, কাবিখার প্রকল্পগুলোর যথাযথ কাজ করা পরেই বিল দেওয়া হয়েছে। আর টিআর প্রকল্পগুলোর অগ্রিম বিল প্রদান করা হয়। তিনি স্বীকার করেন, ‘প্রকল্পগুলো সরেজমিনে দেখা সম্ভব হয়নি।’

ইসলামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য জিয়াউল হক জিয়া জানান, সরকারি বরাদ্দের ব্যাপারে দলীয় নেতাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করে এমপি সাহেব তার পছন্দের লোকদের নামে বরাদ্দ দিয়েছেন। এতে বদনাম হচ্ছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং সরকারের।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, টাকা নিয়ে কাজ না করলে সে টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়া হবে। অন্যথায় আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্থানীয় এমপি ফরিদুল হক খান দুলাল জানান, আমার প্রতিটি প্রকল্পের কাজ ঠিক মতোই চলছে। তা ছাড়া প্রকল্পের কাজের দেখভাল করেন পিআইও ও ইউএনও। কোনো অনিয়ম হলে দেখার দায়িত্ব তাদেরই।

"