সরেজমিন: রাতে শ্রীমঙ্গল অরক্ষিত

নৈশপ্রহরী নেই অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

আবুজার বাবলা, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)

মৌলভীবাজার জেলার পাইকারি ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল শ্রীমঙ্গল। এখান থেকে জেলা সদরসহ আশেপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার ব্যবসায়ীরা পণ্য সংগ্রহ করে থাকেন। এ শহরে প্রতিদিন শত কোটি টাকার পণ্য কেনাবেচা হয়। ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল হিসেবে দিনদিন ব্যাপক পরিচিত লাভ করলেও পাহারাদার না রাখায় রাতের বেলায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অরক্ষিত অবস্থায় থাকছে। রাতের বেলা অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেরই নিরাপত্তা প্রহরী রাখেন না ব্যবসায়ীরা।

এ পরিস্থিতিতে শহরে প্রায়ই ছোট-খাটো চুরির ঘটনা ঘটছে। গত ৬ আগস্ট রাতে শহরের গুহ রোডে অবস্থিত গ্রামীণ ফোনের ডিস্ট্রিবিউটর অফিসের ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার মোবাইল কার্ড চুরি হয়। এর আগে গত ২ আগস্ট উত্তর-উত্তসুর এলাকায় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে চুরির ঘটনায় টাকা, ডলার, মোবাইল ও স্বর্ণসহ প্রায় ৫ লক্ষাধিক টাকার মালামাল খোয়া যায়। এসব এলাকায় কোনো পাহারাদার নিয়োগ ছিল না। আর এর সব দায় এসে পড়ছে থানা পুলিশের ওপর। অপ্রতুল জনবল দিয়ে শহরের হাজার হাজার দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির নিরাপত্তা দিতে হিমশিম খাচ্ছে থানা পুলিশ। পুলিশের পক্ষে বলা হয়েছে, সীমিত জনবল দিয়ে এত বড় থানার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাসাবাড়ির নিরাপত্তা দেওয়া দুরূহ ব্যাপার।

গত বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন রোডে অবস্থিত মার্কেট, বিপণী বিতান, দোকান ও গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকা ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে।

রাত সাড়ে ১২টা। শহরের গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকা হাউজিং এস্টেট। এই এস্টেটে সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার সার্কেল কার্যালয়, কর অফিস, কমিউনিটি সেন্টার, সরকারি স্কুল, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাসহ লন্ডন-আমেরিকা প্রবাসীদের বিলাশবহুল ভবন অবস্থিত। দেখা গেছে হাউজিং এস্টেটের বাসার দরজা-জানালা খোলা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছেন বাসিন্দারা। কিন্তু এ এলাকায় কোনো পাহারাদার দেখা মেলেনি। মৌলভীবাজার সড়কের ৫নং পুল থেকে থানা এলাকা, চৌমুহনা থেকে হবিগঞ্জ সড়ক, স্টেশন রোড, কলেজ রোড ও গুহ রোড় পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন মার্কেট, দোকান, ফিলিং স্টেশন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই কোনো নিজস্ব পাহারাদারের দেখা মেলেনি। ৫নং পুল এলাকায় আল-আমিন ম্যানশন, গ্রামীণ ব্যাংক, মিজান ভিউ মার্কেট, রবি ডিস্ট্রিবিউটর, নাহার ফিলিং স্টেশন, কৃষি ব্যাংক আঞ্চলিক কার্যালয়, নজরুল কমিউনিটি সেন্টার, বেঙ্গল মটরস, মদিনা মার্কেট, সপ্তডিঙ্গা সরবরাহ, ১নং পুল এলাকায় এবি ব্যাংক, আজিজ মার্কেট, খাঁন ম্যানসন, নীলিমা ম্যানশন, আল ফখরী, ভিক্টোরিয়া স্কুল মোড়ে সিঙ্গার, বাটারফ্লাই, বেস্ট বাই, ভিশন ইলেকট্রনিক্স, রিগ্যাল, এসএ পরিবহন, ডিএসবি বেলালের স’ মিল, গ্র্যান্ড তাজ হোটেল ও প্রাইম ব্যাংক ও বিলাস শপিং মল, দোকান ও স্থাপনা থাকলেও এলাকাগুলো ঘুরে মাত্র দুজন পাহারাদার পাওয়া যায়। রাত ২টায় থানা মোড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায় অর্ধ শতাধিক পাইকারি দোকান গুদামের সামনে এলোমেলোভাবে পিয়াজ-রসুনের বস্তা ফেলে রাখা। হবিগঞ্জ রোডের চৌমুহনা থেকে নূর ফুডস এলাকা পর্যন্ত মক্কা মার্কেট, ইউনাইটেড শপিং সেন্টার, সৈয়দ ফসিউর রহমান মার্কেট, মতিন শপিং সেন্টার, হাবিব মার্কেট, সোনালী মার্কেট, আখরা মার্কেট, আওয়ামী লীগের কার্যালয়সহ দোকান, ব্যাংক, মেডিকেল সেন্টার, থাকলেও এই এলাকায় কোনো পাহারাদার খুঁজে পাওয়া যায়নি। পাহারাদার না থাকার পাশাপাশি এই এলাকার অনেক দোকানের সামনে কোনো বাতি জ্বলতে দেখা যায়নি। সেখানকার বেবিস্ট্যান্ড থেকে নোয়াখালী হোটেল পর্যন্ত কয়েকশ’ দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য পাহারাদার পাওয়া যায় মাত্র একজন।

নকুল দাস নামে পাহারাদার জানান, ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ টাকার মুনাফা করলেও পাহারাদারদের জন্য টাকা দিতে চায় না। রাত সোয়া ৩টার দিকে চৌমুহনা থেকে স্টেশন সড়কের রহমান ফিলিং স্টেশন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় এটিএম বুথের সিকিউরিটি গার্ড ছাড়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ২/৩ জন পাহারাদার দেখা পাওয়া গেলেও তা পর্যাপ্ত নয়। এ ছাড়া স্টেশন রোড, ভানুগাছ রোড, গুহ রোড ও কলেজ রোড ঘুরে বেওয়ারিশ কয়েকটি কুকুরের তৎপরতা ছাড়া অন্য কিছুর চিহ্ন পাওয়া যায়নি। শহরের প্রধান প্রধান সড়কের এই চিত্রের পাশাপাশি শহর ও শহরতলীর আবাসিক এলাকার রাতের পরিস্থিতি আরো নাজুক। বেশির ভাগ আবাসিক এলাকাতেই কোনো পাহারা ব্যবস্থা নেই। এ ছাড়া সন্ধানী, বসুন্ধরা, কলেজ রোড, কোর্ট রোড, ডাক বাংলো রোড, রেল গেট এলাকা, জালালিয়া রোড, মাস্টারপাড়া, পূবালী, সাগরদিঘি ও শাপলাবাগ আবাসিক এলাকায় কোনো পাহারাদার নেই। স্টেশন রোড এলাকায় অনিক সুপার মার্কেট, সুফিয়া ম্যানশন, হিরণময় প্লাজা, আহমেদ বিপণী রূপালী শপিং সিটিতে কোনো পাহারাদার দেখা যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ও মার্কেটের ব্যবসায়ীরা স্থানীয়ভাবে কোনো পাহারাদার নিয়োগ দেননি।

শ্রীমঙ্গল থানা সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৪৫১ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত শ্রীমঙ্গল থানার জনসংখ্যা ৩ লাখ ১৮ হাজার ২৫ জন। এ বিপুল জনসংখ্যার নিরাপত্তা দায়িত্বে রয়েছেন ৫৭ জন পুলিশ সদস্য। এর মধ্যে ৩ জন ওসি, ৯ জন এসআই, ১১ জন এএসআই এবং ৪ জন ড্রাইভার, ৩ জন কম্পিউটার অপারেটর, ৩ জন সেন্ট্রি ডিউটি এবং কনস্টেবল ৩৪ জন। এদের মধ্যে থানার প্রশাসনিক কাজ ও সেন্ট্রি পোস্টে সার্বক্ষণিক দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন ১২ জন সদস্য। বাকি জনবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ভিআইপি প্রটোকল, মামলা তদন্ত, পরিদর্শনসহ শহরের মার্কেট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকেন।

এদিকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে পৌর এলাকায় কমিউনিটি পুলিশের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। একইভাবে ইউনিয়ন পর্যায়ে গ্রাম পুলিশের কার্যক্রমও ভেস্তে গেছে।

শ্রীমঙ্গল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এ এস এম ইয়াহিয়া বলেন, আমরা সমিতি থেকে ব্যবসায়ীদের আগেও জানিয়ে দিয়েছি মার্কেট ও নিজ নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা প্রহরী রাখতে। এরপরও তারা যদি প্রহরী না রাখে তার দায় শুধু পুলিশের ওপর দিলে হবে না। আমরাও (সমিতি) তার দায় বহন করব না।

জানতে চাইলে শ্রীমঙ্গল উপজেলা চেয়ারম্যান ও কমিউনিটি পুলিশিং উপজেলা কমিটির সভাপতি রনধীর কুমার দেব বলেন, রাতের নিরাপত্তা বিধানে কমিউনিটি পুলিশের কর্মকান্ড আপাতত না থাকলেও সামাজিক নানা বিরোধ নিষ্পত্তিতে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম চালু আছে।

পৌর পুলিশের তৎপরতা বিষয়ে মুঠোফোনে পৌরসভার চেয়ারম্যান মহসিন মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, পয়সার অভাবে পৌরসভার কমিউনটি পুলিশিং কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাত পেতেও ৫০-১০০ টাকা পাওয়া যায় না। এসব কারণে এই সেবা বন্ধ রয়েছে।

প্যানেল চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলর মীর এম এ সালাম জানান, ২০০৮ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত পৌর পুলিশের তৎপরতা ছিল। এরপর জনগণের সহায়তা না পাওয়ায় অর্ধ লক্ষাধিক টাকার দেনার ভারে পৌর পুলিশের তৎপরতা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আশরাফুজ্জামান বলেন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মালিকদের নিজস্ব পাহারাদার নিয়োগের জন্য শহরের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মার্কেট মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করব। পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন সোসাইটির সঙ্গে কথা বলব। যাতে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় ১/২ জন করে পাহারাদার নিয়োগ দেওয়া হয়। জানতে চাইলে শ্রীমঙ্গল থানার ওসি কে এম নজরুল বলেন, শ্রীমঙ্গল থানায় ওসির দায়িত্ব নেওয়ার সময় অনেক মার্কেট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় পাহারাদার ছিল। এখন প্রায় সবাই পাহারা বন্ধ করে দিয়েছে। জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে এখন চুরি হয় না। সীমিত জনবল নিয়ে রাতের জননিরাপত্তা বিধানে হিমশিম খাচ্ছি। তিনি বলেন রাতে জননিরাপত্তার জন্য মাঠে পুলিশের সাতটি টিম কাজ করছে। ঈদকে সামনে রেখে আরো দুটি টিম বাড়ানো হবে।

 

"