আগুনমুখা নদীর ভাঙন কেড়ে নিয়েছে মানুষের ঘুম

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

শাকিল আহম্মেদ, রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী)

আগুনমুখায় স্রোত বাড়লে, ভাঙনের তিব্রতাও বাড়ে। ভাঙনে কমে যাচ্ছে ভূখ-ের আয়তন। ভিটেবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে কেউ হচ্ছেন ভূমিহীন, কেউবা নিঃস্ব। এ প্রতিকূলতা কাটিয়ে তারা যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, তখন সব হারিয়ে আবার হচ্ছে সর্বশ্বান্ত। এর মধ্যেও যারা টিকে আছে, বেড়িবাঁধ বিলীন হওয়ায় তারাও জোয়ারে ডুবছে আর ভাটায় ভাসছে। প্রতিনিয়ত তাদের আর্তনাদে এখানকার বাতাস ভারী হয়ে আছে। অথচ তাদের রক্ষায় কেউ এগিয়ে আসছে না।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙনের কবলে পড়েছে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের উত্তর চালিতাবুনিয়া, মধ্য চালিতাবুনিয়া, বিবির হাওলা ও গোলবুনিয়া গ্রাম। একসময় এখানে অসংখ্য বসতি ছিল। মানুষের কোলাহল ছিল। শিশুদের কান্না ছিল। আনন্দ-উৎসবের বন্যা ছিল। আর আজ চারদিকে শুধু পানি আর পানি। সবই কেড়ে নিয়েছে রাক্ষুসে আগুনমুখা নদী। আর এর সঙ্গে কেউ হয়েছেন নিঃস্ব। কেউ সব হারিয়ে ভিখারি। জমিজমার মালিক এক রাতেই হয়ে গেছেন দিনমজুর। এদের মধ্যে কেউ উঁচু জায়গায় গিয়ে বসতি গড়েছেন, কেউ আবার জন্মভূমি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।

এখন ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন উত্তর চালিতাবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা পলি বেগম (৪০)। স্বামী দুদা মুফতি, পেশায় ক্ষুদ্র জেলে। ছেলেমেয়েসহ পাঁচ সদস্যের সংসার। এর আগেও দুবার ভাঙনে তার ভিটেবাড়ি বিলীন হয়ে যায়। নতুন করে সংসার গোছানো শুরু করতে না করতেই আবারও ভাঙনের মুখে পড়েছে। পলি বেগমের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘দিনে জোয়ার যেই সময় আয়, বাচ্চা-গাচ্চা নিয়া রাস্তায় থাহি। আবার ভাডায় (ভাটায়) ঘরে আই। আবার রাত্রে জোয়ার আইলে আমরা ঘুমাই না, জাইগা (জেগে) থাহি। কহন যে ঘরডা নদীতে ভাসাইয়া লইয়া যায়, হেই চিন্তায় থাহি। আমাগোরে বাঁচান।’

পলি বেগমের প্রতিবেশী ছিল আলমগীর মুন্সি (৬৫)। কিন্তু এক সপ্তাহ আগে তার ভিটেবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। এখন তিনি মূল ভূখ-ে গিয়ে ঝুপরি ঘর বানিয়ে বসবাস করছেন। এ সময় আলমগীরের সঙ্গেও কথা হয়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে আলমগীর বলেন, ‘সর্বনাশা নদীতে আমার ভিটাবাড়ি নিয়া গ্যাছে (গেছে)। আমার সাজানো সংসার শ্যাষ (শেষ)। কী করে যে এহন সংসার করমু, হের (তার) কোনো কূলকিনারা পাই না।’

স্থানীয়রা জানান, আগুনমুখা নদীর ভাঙনের তিব্রতা বেড়ে যাওয়ায় গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ওই ইউনিয়নের উত্তর চালিতাবুনিয়া, মধ্য চালিতাবুনিয়া, বিবির হাওলা ও গোলবুনিয়া গ্রামের প্রায় ৩০টি পরিবার বসতভিটেবাড়ি হারিয়েছে। এ কদিনে ওইসব গ্রামের পাঁচ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। তাই জোয়ারের সময় গ্রামগুলোর বসতবাড়ি ও ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যায়। চালিতাবুনিয়া ইউনিয়ন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন বলেন, বেড়িবাঁধ না থাকায় দুই সপ্তাহে চারটি গ্রামে জোয়ারের পানি উঠে ২০ হেক্টর জমির আমন বীজতলা নিমজ্জিত হয়ে আছে। এরই মধ্যে ১০ হেক্টর জমির বীজতলা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ওই চার গ্রামে ভাঙনে বসতভিটেবাড়ি হারানো মানুষগুলো উঁচু স্থানে গিয়ে বসবাস শুরু করেছে। কেউ আবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। এ ছাড়া এসব গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ এখন ভাঙনের মুখে রয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে নদীতীরবর্তী মানুষগুলো নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। অন্যদিকে মধ্য চালিতাবুনিয়া গ্রামে অবস্থিত রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রটি যেকোনো মুহূর্তে নদীতে গ্রাস করে নিতে পারে। কেন্দ্রটি ভাঙনের মুখে রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, অচিরেই ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের মানচিত্র থেকে এই চারটি গ্রাম হারিয়ে যাবে।

চালিতাবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বলেন, ‘প্রায় ১৫ দিনে পাঁচ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ এবং ৩০টি পরিবারের বাড়িঘরসহ ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখন তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাই অচিরেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তা না হলে আয়তন কমতে কমতে চালিতাবুনিয়া পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’

কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের বলেন, ‘চালিতাবুনিয়ার বেড়িবাঁধ নদীতে বিলীন হওয়ার কথা শুনেছি। কিন্তু চালিতাবুনিয়ার জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। বরাদ্দ না পেলে আমরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারব না। অন্যান্য রাজস্ব খাতে প্রস্তাব দেব। যদি বরাদ্দ হয়, কাজ হবে।’

এ ব্যাপারে পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের এমপি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘নদীভাঙনের কথা আমি জানি। সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টকে আমি বলেছি। তারা পদক্ষেপ নেবে।’

"