নরসুন্দা যেন ময়লার ভাগাড়

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

আকিব হৃদয়, কিশোরগঞ্জ

কিশোরগঞ্জের এক সময়ের খরোস্রোতা নদী নরসুন্দা এখন যেন শহরের ডাস্টবিন। শহরের বেশির ভাগ ময়লাই ফেলা হচ্ছে সেখানে। বিশেষ করে শহরের পুরানথানা, একরামপুর, কাচারি বাজার এলাকার অবস্থা খুবই নাজুক। অভিযোগ আছে, নরসুন্দা খননের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প অনুমোদন হলেও একটি গোষ্ঠীর লুটপাটের কারণে তা সম্পন্ন হয়নি। ফলে নরসুন্দা দিনদিন একটি অভিশাপে পরিণত হচ্ছে।

পরিবেশ কর্মীদের অভিযোগ, শহরে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অকেজো হয়ে পড়ায় কাঁচাবাজারের উচ্ছ্বিষ্ট ও মাছ-মাংস বাজারের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নরসুন্দার বুকে। ফলে নরসুন্দা দিনদিন একটি অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। তবে পৌর মেয়র বলছেন, নদীতে ময়লা ফেলার বিষয়টি তারা অবগত নন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুরানথানা এবং কাচারি বাজারে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার মাছ বিক্রি করা হয়। এইসব মাছের উচ্ছ্বিষ্ট ফেলা হয় নরসুন্দার বুকে। মাংস বাজারে বিক্রির জন্য প্রতিদিন ২০-২৫ গরু জবাই করা হয়। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় এই জবাইকৃত পশুর বর্জ্য ও রক্ত ফেলা হয় নদীতে। শহরের কাচারি বাজারে মাছ, কাঁচা তরি-তরকারি ইত্যাদি বিক্রয় করা হয়। কাঁচাবাজারের উচ্ছ্বিষ্ট আবর্জনাও ফেলা হচ্ছে সেখানে। এতে করে কাচারি বাজারের আশেপাশে যেমন দুর্ঘন্ধ তৈরি হয়, তেমনি নদীতে বর্জ্য-আবর্জনা ফেলায় মারাত্মক দূষণের স্বীকার হচ্ছে নদী। এ ছাড়া শহরের পুরানথানা, একরামপুর, উকিলপাড়া, খড়মপট্টি এলাকার বাসাবাড়ির সব ময়লা সরাসরি ফেলা হয় নদীতে।

সরেজমিনে শহরের গৌরাঙ্গ বাজার সেতু ও পুরানথানা সেতুর নিচে তাকালে মনে হয় একটি উন্মুক্ত ডাস্টবিনের ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন। শহরের পুরানথানা এলাকার বাসিন্দা ফরহাদ আহমেদ টিটুল বলেন, সেতুর ওপর থেকে নিচে তাকালে এখন আর আগের নরসুন্দা খুঁজে পাওয়া যায় না। এখন যেদিকে চোখ যায়, শুধু ময়লা আর আবর্জনা। কাচারি বাজারের সামনেই কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়। নরসুন্দায় ফেলা বর্জ্যরে দুর্গন্ধে অতিষ্ট স্কুলের শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের ছাত্র সাজু বলেন, দুর্গন্ধের কারণে ঠিকমতো ক্লাস করতে পারি না, ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারি না। কাচারি বাজারের পাশ দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করেন পথচারী মো. বাচ্চু খান। তিনি বলেন, আমি প্রতিদিন কাচারি বাজারের পাশের লেক দিয়ে হাঁটাহাটি করি, কিন্তু হাঁটার সময় আমার নাকে খুব বাজে একটা দুর্গন্ধ লাগে, যা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে।

কিশোরগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির ছাত্রী জাহানারা আক্তার সাবিনা বলেন, কাচারি বাজারের পাশ দিয়ে বাসায় ফেরার সময় বাজে পঁচা দুর্গন্ধ আমার নাকে লাগে, তাই নাকে সব সময় রুমাল ধরে আসতে হয়।

স্থানীয় পরিবেশ কর্মী ও সংগঠকরা জানান, ২০০৫ সালে ‘নরসুন্দর বাঁচাও’ নামে একটা আন্দোলন হয়। এতে সদরের প্রায় সব সাংস্কৃতিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন এতে যুক্ত হয়। আন্দোলনের মুখে তৎকালীন স্থানীয় এমপি সব দাবি মেনে নিয়ে নরসুন্দা রক্ষায় উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু গত এক যুগের বেশি সময়ে এ নিয়ে কোনো কাজই হয়নি বলে তাদের অভিযোগ।

অনলাইন পোর্টাল নরসুন্দা ডট কম-এর সম্পাদক ও লেখক ফয়সাল আহমেদ বলেন, এক যুগেরও বেশি সময় আগে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আমরা নরসুন্দা রক্ষায় প্রতিশ্রুতি আদায় করে ছিলাম, কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি আরো বলেন, প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি শহরের বাসিন্দাদেরও নরসুন্দা দূষণের বিরুদ্ধে সচেতন হতে হবে। নিজেরা সচেতন না হলে প্রশাসনিক উদ্যোগও একে রক্ষা করতে পারবে না।

কিশোরগঞ্জের পরিবেশবাদী সংগঠন পরিবেশ রক্ষা মঞ্চ (পরম)-এর সভাপতি অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ সাদী প্রতিদিনের সংবাদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, নরসুন্দা খননের নামে প্রকৌশল বিভাগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং একটি অদৃশ্য রাজনৈতিক মহলÑএই ত্রিভুজ চক্র গোষ্ঠী সুন্দর প্রকল্পটিকে লুটপাঠ করে নষ্ট করে দিয়েছে। যার ফলে নরসুন্দা দিনদিন একটি অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলার ফলে পরিবেশ যেমন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তেমনি দূষিত হচ্ছে নদী।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-এর কিশোরগঞ্জ সভাপতি প্রফেসর আবদুল গনি জানান, নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা যেমন পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলে তেমনি জীব বৈচিত্র্যের মারাত্মক প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, অতি দ্রুত এসব ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার না করলে হারিয়ে যাবে নদী নষ্ট হবে নদীর সুষ্ঠু পরিবেশ।

এসব ব্যাপারে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মো. পারভেজ মিয়া প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, নদীতে ময়লা ফেলার বিষয়টি আমার অবগত না। আমাদের পৌরসভা থেকে ময়লা ফেলার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে, আমরা ময়লা-আবর্জনা ওই জায়গাতেই ফেলি। তারপরেও যদি কেউ নদীতে ময়লা ফেলে তাহলে আমি পৌরসভা থেকে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরো বলেন, খুব দ্রুতই নরসুন্দা পরিষ্কার অভিযান শুরু হবে এবং কিশোরগঞ্জবাসীকে একটি সুন্দর ও পরিষ্কার নরসুন্দা নদী উপহার দেওয়া হবে।

 

"