ভূমিহীনদের আশ্রয়কেন্দ্র

৩০ বছর ধরে চর হোগলাবুনিয়া গ্রামে স্বপ্ন বুনছে ২০ পরিবার

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

শাহ আলম তালুকদার, মোড়েলগঞ্জ (বাগেরহাট)

বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলা এবং পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার সীমান্তবর্তী বলেশ্বর নদী তীরবর্তী চর হোগলাবুনিয়া আদর্শ গ্রামে গত ৩০ বছর ধরে ২০টি পরিবার বসবাস করছে। এখানে নানা সমস্যা ও সংকটের মধ্যেও ভূমিহীন মানুষগুলোর মধ্যে আনন্দের ছাপ লক্ষ করা যায়। ফলে জন্মস্থানেই থাকার সুযোগ হয়েছে ২০টি পরিবারের প্রায় ১০০ মানুষের।

সরকারি উদ্যোগে খাস জমিতে গুচ্ছগ্রাম থেকে আদর্শ গ্রামে রূপ নেওয়া ২০টি পরিবারের বসবাসের মধ্য দিয়ে। তারা জানান, বিগত ৩০টি বছর ধরে তারা সেখানে বসবাস করছেন। প্রতিটি পরিবারকে সাড়ে চার শতক করে জমি দিয়েছিল সরকার। সঙ্গে টিনশেডের ঘর করার জন্য দেওয়া হয়েছিল কিছু উপকরণও। বরাদ্দ পাওয়া জমির মালিকদের অনেকেই আজ নেই। কিন্তু তাদের সন্তানসহ আত্মীয়-স্বজনরা আজো সেখানে আশ্রত।

মোড়েলগঞ্জ উপজেলার ১০ নম্বর হোগলাবুনিয়া ইউনিয়নের চর হোগলাবুনিয়া গ্রামের আদর্শ গ্রামে গিয়ে কথা হয় মোশারফ হোসেন শরীফের সঙ্গে। পার্শ্ববর্তী গুয়াবাড়িয়ায় গ্রামের মৃত গয়জদ্দিন শরীফের ছেলে সে। নয় ভাই-বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই সে। একসময় সে কাঠমিস্ত্রির কাজ করত। পিতার জমি-জমা না থাকায় মামা বাড়িতেই থাকতেন। পরে মতিয়ার রহমান গাজী নামের একজন ইউপি সদস্যের কাচারীতে আশ্রয় নেন। এখন যেখানে তিনি বাস করছেন সেটি ছিল এক সময় বিল। বলেশ্বরের চর হিসেবেই সেটি পরিণত হয় খাস জমিতে।

তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান সারোয়ার হোসেনের চেষ্টায় তিনিসহ সর্বমোট ২০টি পরিবার গুচ্ছগ্রামে আশ্রয় পান ১৯৮৮ সালে। সর্বমোট ৯০ শতক জমি ২০টি পরিবারের মধ্যে সমভাবে বণ্টন করে তৎকালীন সরকার। পাশেই এক একরের একটি পুকুর রয়েছে। সেটিও দেওয়া হয় গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দাদের। মাত্র সাড়ে চার শতক করে জমির ওপর কোনোরকমে ঘর তুলে থাকতে শুরু করেন তারা। দিনমজুরি আর মাছ ধরাই তাদের মূল পেশা। একমাত্র মোশারফ হোসেনসহ ২-১ জন মুদি দোকান দিয়ে সংসার চালান। বাকিরা দিনমজুরি, ভ্যান চালানো বা মাছ ধরা পেশায় নিয়োজিত। ৩০ বছর ধরেই তারা সেখানে আশ্রয়ের সুযোগটি পেয়ে অত্যন্ত সাদামাটাভাবেই জীবন চালিয়ে আসছেন। আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা হাতেম আলী শেখ ও তার মেয়ে তাহমিনা বললেন, আদর্শ গ্রামে থাকার জায়গাটুকু পাওয়ায় তাদেরকে আর শহরমুখী হতে হয়নি। এটি না পেলে হয়তো তাদেরকে সন্তান-সন্তুতি নিয়ে কোন এক শহরে গিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতে হতো। যা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হতো না। আ. সালাম শেখের স্ত্রী রাবেয়া বললেন তারা মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছেন বলেই একেবারে ছন্নছাড়া হতে হয়নি। আদর্শ গ্রাম পরিদর্শনের সময় কথা হয় তোতা মিয়া, হেমায়েত উদ্দিন, ছায়দুর রহমান, নেছার উদ্দিন ফরাজীসহ অনেকের সঙ্গে। যাদের অনেকের সন্তানই খুলনা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে গিয়ে নানান কাজ করছেন। অবশ্য ২-১জন সেখানে অবস্থান করেই গরুর ফার্ম করাসহ নানা কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন।

আদর্শ গ্রামের বাসিন্দাদের বর্তমানে কিছু সমস্যাও রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে প্রতিটি বাড়িই পানিতে তলিয়ে যায় এবং ওই ২০টি পরিবারের জন্য কোনো কবরস্থান নেই। এ জন্য দ্রুত সেখানে মাটি ভরাট কর্মসূচি ও একটি কবরস্থানের জায়গা দেওয়ার জন্য তারা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছেন। চেয়ারম্যানের মাধ্যমেই আদর্শ গ্রামের বাসিন্দাদের চাহিদার কথা উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে একজন তহসিলদার এসে এখানে জরিপ করে গেছেন। হয়তো কিছু অনুদান সরকারের পক্ষ থেকে পাওয়া যাবে। এ ব্যাপারে ইউএনও মো. কামরুজ্জামান বলেন, উপজেলার একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের উন্নয়নের জন্য সম্প্রতি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। হয়তো শিগগিরই বরাদ্দ পাওয়া যাবে। নতুন করে বরাদ্দ আসলে এর উন্নয়ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু সেটি কি চর হোগলাবুনিয়া আদর্শ গ্রাম কি না সেটি তার জানা নাই।

তবে উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আলমগীর হুসাইন বলেন, চর হোগলাবুনিয়া আদর্শ গ্রামের জন্য তাদের নতুন করে কোনো প্রকল্প নেই। প্রস্তাবনাও নেই। কেননা এ ধরনের প্রকল্প একবারই সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়। শুরুতে সেখানকার বাসিন্দাদের জমি ও ঘর দেওয়া হয়েছে। এখন তাদের উচিত নিজেদের মতো করে আত্মকর্মসংস্থান মূলক কাজের দিকে এগিয়ে যাওয়া। তবে বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে ঋণ সহযোগিতার ক্ষেত্রে তারা সহযোগিতা করতে পারেন বলে তিনি জানান।

 

"