ঝালকাঠিতে অনুমোদন পায়নি ২ সাপের খামার

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

মো. রাজু খান, ঝালকাঠি

সাপের নাম শুনলেই আঁতকে উঠে সবাই। আর ভয়ঙ্কর এই সাপকে বুকে টেনে নিয়েছে নলছিটি উপজেলার তৌকাঠি গ্রামের জিয়াদ মোল্লা, ঝালকাঠি শহরের নুরুল ইসলাম ও রাজাপুর উপজেলা সদরের সালাহ উদ্দিন মৃধা। তারা তিনজনেই পটুয়াখালীর ‘স্বর্পরাজ’ আবদুল রাজ্জাক বিশ্বাসের শিষ্য। এর মধ্যে নুরুল ইসলাম সাপ ধরেন এবং পোষেন। ক্রেতা পেলে বিক্রি করেন। খামার পদ্ধতিতে সাপ পালন করছেন জিয়াদ ও সালাহ উদ্দিন। সাপের খামারের বিষয় নিয়ে পৃথকভাবে কথা হয় সাপের এ দুই খামারির সঙ্গে।

তারা জানান, সাপের খামারে বিষ উৎপাদন করে কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হয়। বিভিন্ন মেডিসিন (ওষুধ) সাপের বিষ দিয়েই তৈরি করা হয়। এ জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিশেষ থেকে সাপের বিষ আমদানি করতে হয়। ইউটিউবে (ইন্টারনেটে) সাপের খামার ও সাপ ধরার কৌশল দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে আবদুর রাজ্জাক বিশ্বাসের কাছ থেকে দিক্ষা নিয়ে তারা এ সাপের খামার তৈরি করেন। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে সাপ মারতে নিষেধ করা হয়েছে। কোথাও সাপের সন্ধান পেলে আমাদের খবর দেয়। আমরা গিয়ে সাপ ধরে এনে এলাকাবাসীকে সাপের আতঙ্কমুক্ত করি।

নলছিটি উপজেলার কুলকাঠি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম মোল্লার ছেলে জিয়াদ মোল্লা জানান, ইউটিউবে তিনি সাপের খামার দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে পটুয়াখালীর আবদুল রাজ্জাক বিশ্বাসের কাছে গিয়ে তিন মাসের প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে নিজ বাড়ি সংলগ্ন পতিত জমিতে একটি টিনশেড বিল্ডিং করেন। বিল্ডিংয়ের ভেতরের একপাশে দুটি হাউস করেন। সেখানের একটি হাউসে সাপের খাবার দেওয়া হয় আর অন্যটিতে সাপের গোসল করানো ও প্রজননের জন্য ব্যবহার করা হয়। নলছিটি পৌর শহরের স্যানিটারি ব্যবসার ফাঁকে ফাকে তিনি পরিচর্যা করেন। নিয়মিত পরিচর্যার জন্য তিনি আবার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন স্থানীয় কৃষক নাছির হাওলাদার ও মসজিদের ইমাম তৌহিদুল ইসলামকে। তারাই সার্বক্ষণিক সাপের খামারের দেখাশোনা করেন। এই সাপ খামারি আরো বলেন, সরকারি অনুমোদনের জন্য ঢাকা প্রাণিসম্পদ বিভাগে আবেদন করেছি। ঝালকাঠি জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসেও অনুলিপি দেওয়া হয়েছে। জেলা কর্তৃপক্ষ সরেজমিন পরিদর্শনে সত্যতা পেয়ে রিপোর্ট দিলে অনুমোদন পাব বলেও আশা করেন তিনি। খামারের পরিচর্যাকারী নাছির হাওলাদার জানান, জিয়াদ ভাই সাপ ধরার ট্রেনিং (প্রশিক্ষণ) নিয়ে এসে আমাদেরকেও শিখাইছে। আমরা ক্ষেতে খামারে কাজ করি। যখনই কোথাও সাপের উপদ্রব দেখা দেয় সেখান থেকেই আমাদের খবর দেওয়া হয়। আমরা গিয়ে সাপ ধরে এনে ওই এলাকার মানুষকে আতঙ্কমুক্ত করি। তৌহিদুল ইসলাম জানান, সাপ ধরে মানুষকে আতঙ্কমুক্ত করাও এক ধরনের মানবসেবা। অন্যদিকে সাপ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। সরকারি অনুমোদন পেলে সাপের বিষ উৎপাদন করে বিদেশে রফতানি করতে পারলে কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। স্থানীয় কলেজ ছাত্র সাব্বির জানান, আমাদের এলাকায় গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমে অনেক সাপ দেখা যেত। সন্ধ্যার পরে সাপ আতঙ্কে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারতাম না। সাপ ধরার অভিজ্ঞ লোক ও সাপের খামার থাকার কারণে আমরা এ আতঙ্ক থেকে বেঁচে গেছি। এলাকার কোথাও সাপের সন্ধান পেলে সাপের খামারের কর্তৃপক্ষ গিয়ে সাপ ধরে নিয়ে আসে। সাপের খাবার ও পরিচর্যা সম্পর্কে খামারি জিয়াদ সিকদার জানান, সাপের খাবারের জন্য বাজার থেকে কিছু কিনতে হয় না। সাপের সবচেয়ে প্রিয় খাবার ইদুর। গ্রামের ঘরে ঘরে ইঁদুর ধরার ফাঁদ দেওয়া আছে। সেই ফাঁদে ইদুর ধরা পড়লে আমার লোক গিয়ে নিয়ে আসে। সপ্তাহে একদিন খাবার দিলেই হয়। শীতকালে মাসে একবার খাবার দিলেও চলে। সাপের পাল্টানো খসি ও মল পরিষ্কার করে রাখতে হয়। গত জানুয়ারি মাসে এটি চালু করেছি। এখন পর্যন্ত গোখরা, দাড়াশ ও কিং কোবরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির ২৯টি সাপ আছে বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে রাজাপুর উপজেলা সদরের মৃধাবাড়িতে সালাউদ্দিন মৃধা নামে এক যুবক সাপের একটি খামার গড়ে তুলেছেন। সালাউদ্দিন মৃধার বাসার পাশে টিনশেডের একটি ঘরে মুরগির খামার ছিল। দুই বছর আগে মুরগির খামার বন্ধ করে বিষধর সাপের খামার করেন তিনি। বিভিন্ন স্থান থেকে নিজে ও লোক দিয়ে বিষধর সাপ ধরে এনে পালন করা শুরু করেন। এখন তার খামারে ৩০টি সাপ রয়েছে। খামারের মালিক সালাউদ্দিন মৃধা বলেন, ‘টেলিভিশনে দেখে ও পটুয়াখালীর রাজ্জাক বিশ্বাসের অনুপ্রেরণায় সাপের খামারটি গড়ে তুলেছি। বর্তমানে এ খামারে ৩০টি গোখরা শঙ্খিনী জাতের সাপ রয়েছে। সরকারি অনুমোদন পাওয়ার জন্য গত ছয় মাস আগে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরে আবেদন করেছি। অনুমোদন পেলে এ খামার থেকে বছরে কোটি টাকার বিষ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। তা ছাড়া এটা অবৈধ নয়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই খামারে সাপ পালন করা হচ্ছে।

ঝালকাঠি জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কৃষিবিদ আবদুল হান্নান জানান, ঝালকাঠি উপকূলীয় একটি জেলা। এ ধরনের এলাকায় সাপের উপদ্রব বেশি থাকে। সাপ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী একটি জাতীয় সম্পদ। এ জন্য এ অঞ্চলে সাপুড়েদের সংখ্যাও একটু বেশি। জেলার রাজাপুর ও নলছিটিতে দুটি সাপের খামার হয়েছে শুনেছি। তারা আমার কাছে অনুমোদনের জন্য আসছিল। অনুমোদন দেওয়া আমাদের কাজ না, এটা ঢাকা অফিসের কাজ। ঢাকা থেকে তারা যদি অনুমোদন পায় তাহলে সেখানে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে উদ্যোক্তা তৈরি হলে বেকার যুবকরা আগ্রহী হয়ে অন্যান্য খামারের ন্যায় সাপের খামারও তৈরি করতে পারবে।

"