পাহাড় কাটা মাটিতে নাব্যতা হারাচ্ছে উখিয়ার খালগুলো

জলাবদ্ধতায় আমন চাষাবাদ ব্যাহত * এনজিও কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত ছয় খাল খনন করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা এখনো বাস্তবায়ন করেনি

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া (কক্সবাজার)

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবির নির্মাণ ও তাদের মানবিক সেবায় নিয়োজিত দেড় শতাধিক এনজিও নির্বিচারে পর্বত সমমানের পাহাড়, টিলা কেটে সমতল করলেও মাটি ধরে রাখার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে চলতি বর্ষা মৌসুমে ভারী বৃষ্টিপাতের সঙ্গে পাহাড় কাটা মাটিতে ভরাট হয়ে নব্যতার সংকটে পড়েছে অধিকাংশ খাল, ছড়া ও জলাশয়। এমনকি পলি জমে চাষাবাদ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে প্রায় পাঁচ শতাধিক হেক্টর চাষাবাদযোগ্য জমি। বৃষ্টির পানি পাহাড়ি ঢলে অধিকাংশ নিচু এলাকা জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে জনদুর্ভোগ বেড়েছে বলে দাবি করছেন কৃষক ও ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসী।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে সমন্বয়ে এনজিওদের বৈঠকে ছয়টি খাল খনন করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। আর চলতি মৌসুমে ৯ হাজার ৪২০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও, পলি জমে ওঠায় প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ করা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছে উপজেলা কৃষি অফিস। কৃষি বিভাগ, পরিবেশ অধিদফতর ও বন বিভাগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, সরকার রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এনজিওরা তাদের আখকে গোছানোর জন্য উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালী, সফিউল্লাহ কাটা, তাজনিমারখোলা, মনিরঘোনা, বালুখালী, জামতলী, তেলখোলা, মোছারখোলা, রাজাপালং ইউনিয়নের লম্বাশিয়া, মধুরছড়া, মাছকারিয়া এলাকায় প্রায় শতাধিক পর্বত সমমানের পাহাড় টিলা কেটে সমতল করেছে। সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে এনজিও সংস্থার বিভিন্ন আবাসন ও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবির।

পালংখালী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ও কৃষক মোজাফ্ফর সাওদাগর জানান, রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের নামে যত্রতত্র পাহাড় কাটা হলেও পাহাড়ের মাটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যে কারণে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে মাটি গিয়ে থাইংখালী ও পালংখালী খাল ভরাট হয়ে নব্যতা হারিয়েছে। তিনি আরো বলেন, আশ্রয় শিবির সংলগ্ন এলাকায় চাষাবাদ উপযোগী পাঁচ শতাধিক হেক্টর জমিতে বালি মিশ্রিত মাটির পলি জমে আমন চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। পানি চলাচলের বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় অধিকাংশ নিচু এলাকা জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে জনদুর্ভোগ বেড়েছে। থাইংখালীর চিংড়ি চাষি আলতাজ আহম্মদ জানান, তার প্রায় পাঁচ একর জমিতে পাহাড়ের মাটি ও বালি জমেছে। ওই জমি চাষাবাদ উপযোগী করতে তাকে শ্রমিক দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে মাটি সরাতে হচ্ছে।

স্থানীয় বেশ কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাহাড় কাটা মাটিতে পুরো খালটি ভরাট হয়ে যায়। এ খাল অবিলম্বে খননের আওতায় আনা না হলে পুরো পালংখালী ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সমন্বয়ে এনজিওদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছিল। ওই বৈঠকে এনজিওরা ছয়টি খাল খনন করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা এখনো পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে ৯ হাজার ৪২০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, পাহাড় কাটা মাটি বিভিন্ন কৃষি জমিতে গিয়ে পলিজমে ওঠার কারণে প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ করা সম্ভব হবে না। কৃষি জমি খালের ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে বেশ কয়েকটি গ্রাম।

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক সাইফুল আশরাফ বলেন, সরকার মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু এনজিওগুলো যেভাবে পাহাড় কেটেছে তাতে পরিবেশের মারাত্মক বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে। পাহাড় কাটা মাটি যাচ্ছে জমিতে। তিনি আরো বলেন, বিষয়টি আমি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পরিবেশ অধিদফতরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করার জন্য নোটিশ প্রধান করা হয়েছে। তারা যদি না মানে আমার করার কিছু নেই। জানতে চাইলে দক্ষিণ বন বিভাগীয় কর্মকর্তা আলী কবির প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, পাহাড় কাটার ব্যাপারে বেশ কয়েকবার পদক্ষেপ নিয়েও কোনো কাজ হয়নি। তাই এ ব্যাপারে আমার করার কিছু নেই। যেহেতু সরকার মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। তাদের নিরাপদ বসবাসের নামে এনজিওরা নির্বিচারে পাহাড় কাটছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নিকারুজ্জআমান বলেন, এনজিও সংস্থা আইএমও বালুখালী খালকে খনন করেছে। কিন্তু পালংখালী খাল খননের ব্যাপারে স্থানীয় চেয়ারম্যান অভিযোগ করেছে। বিষয়টি তিনি সরেজমিন পরিদর্শন করার জন্য সংশ্লিষ্ট এনজিও সংস্থার উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন।

"