পদ্মা ও যমুনার পানি বৃদ্ধিতে ভাঙনের মুখে ৩ উপজেলা

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

বর্ষা মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গে পানি বাড়তে শুরু করেছে দেশের আন্তর্জাতিক ও আন্তঃদেশীয় নদীগুলোতে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নদী ভাঙন। গত কয়েকদিনে যমুনার ভাঙনের শিকার হয়েছে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার চার ইউনিয়নের ১৫টি গ্রাম। এ ছাড়া পদ্মার ভাঙনের মুখে পড়ে বিলিন হয়ে গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদরের ১৫০ পরিবারের ঘর-বাড়ি এবং মাদারীপুরের শিবচরের চরাঞ্চলের তিনটি বিদ্যালয়। আমাদের সিরাজগঞ্জ ও শাহজাদপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও মাদারীপুরের শিবপুর উপজেলা প্রতিনিধির পাঠান খবর:

সিরাজগঞ্জ-শাহজাদপুর : যমুনার পানি বৃদ্ধি শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরি, সোনাতুনি, খুকনি ও জালালপুর ইউনিয়নের কমপক্ষে ১৫টি গ্রামে নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইতোমধ্যেই এ সব গ্রামের অন্তত দুই শতাধিক ঘর-বাড়ি, দোকানপাট, মসজিদ, ৫০০ বিঘা আবাদি জমি ও দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

এলাকাবাসী জানায়, গত এক সপ্তাহে ভাটপাড়া এলাকার যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধের পাঁচটি স্থানের অন্তত এক হাজার ফুট এলাকার সিসি ব্লক ও জিও টেক্সপেপার নদীগর্ভে ধসে গিয়ে বিলীন হয়ে যায়।

ভাঙন কবলিত এলাকাবাসীর অভিযোগ, সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) গত বছরের ভাঙন এলাকা মেরামত না করায় এবং এ বছর এখনো ভাঙন রোধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ভাঙন আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে।

অবস্থার সত্যতা স্বীকার করে কৈজুরি ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম, জালালপুর ইউপি সুলতান মাহমুদ ও সোনাতুনি ইউপি লুৎফর রহমান প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অতি দ্রুত ব্যবস্থা নিতে তারা অনুরোধ করেন।

এলাকাবাসী জানান, ভাঙন রোধে গত ছয় বছর আগে ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে শাহজাদপুরের কৈজুরী থেকে বেনুটিয়া পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার এলাকায় তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়। গত চার বছর ধরে এ বাঁধে কোনো সংস্কার কাজ না করায় বাঁধের বিভিন্ন স্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। ওই সব দুর্বল স্থানে ছোট ছোট গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় সেখানে নতুন করে ধস দেখা দিয়েছে। এ ধসে মুহূর্তের মধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয় যাচ্ছে পাথরের ব্লক ও জিও টেক্স পেপার।

এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, টাকার সংকুলান না থাকায় আপাতত বাঁধ রক্ষায় কাজ করা যাচ্ছে না। তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, ভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে।

অপর দিকে উপজেলার পোতাজিয়া-রেশমবাড়ি, বাড়াবিল-চুলধরি ও বৃ-আঙ্গারু লো-হাইড পাকা সড়ক বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় সব প্রকার যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ : পদ্মায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার সদর উপজেলার চরবাডাঙ্গা ইউনিয়নে কাইড়াপাড়ার ১৫০ পরিবারের ঘর-বাড়ি নদী গর্ভে চলে গেছে। চরম হুমকির মুখে রয়েছে বিজিবি ক্যাম্প, চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন কমপ্লেক্সসহ আশেপাশের শত শত বাড়ি-ঘর, মসজিদ-মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আমবাগান ও ফসলি জমি। সরেজমিনে ভাঙনকবলিত এলাকায় গিয়ে এ চিত্র দেখা যায়।

স্থানীয় একাধিক পরিবার জানিয়েছেন, ঈদুল ফিতরের পর থেকে শুরু হওয়া ভাঙন সম্প্রতি বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২০০ মিটার এলাকা জুড়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছে নদী। গত তিন দিনের ব্যাপক ভাঙনে প্রায় ১০০ মিটার নদী ভেতরে ঢুকে পড়েছে। বর্তমানে ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীনস্থ চরবাগডাঙ্গা বিওপি থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে অবস্থান করছে নদী। ভাঙনের কবলে পড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে এলাকাটি। ভাঙন প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাউবোকে চিঠি দিয়েছে বিজিবি। ইতোমধ্যে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ সাহেদুল আলম। ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের পরিচালক লে. কর্নেল সাজ্জাদ সরোয়ার বলেন, চরবাগডাঙ্গা বিজিবি ক্যাম্পটি একটি পাকা স্থাপনার ওপর তৈরি। গত কয়েকদিনে পদ্মা নদীর ব্যাপক ভাঙনে চরম হুমকির মুখে পড়েছে। দু-একদিনের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে ক্যাম্পটি নদীতে বিলীন হয়ে যাবে এবং আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি চোরাচালান প্রতিরোধে মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করবে।

ভাঙনের কারণে গত তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্থানীয় ও রাজশাহী পাউবোকে চিঠি দিয়েছি। বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।

শিবচর (মাদারীপুর) : পদ্মা নদীতে অস্বাভাবিক হারে পানি বৃদ্ধি পেয়ে মাদারীপুরের শিবচরের চরাঞ্চলে নদী ভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। আক্রান্ত হয়েছে চরজানাজাত ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়সহ তিনটি স্কুল। হাইস্কুলের ভবন সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হলেও প্রাথমিক স্কুল ভবন দুটি নদী মুখে রয়েছে। এ দিকে গতকাল দুপুরে উপজেলা প্রশাসন ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন।

স্থানীয়রা জানান, পানি বৃদ্ধির কারণে গত ২-৩ দিনে মাদারীপুরের শিবচরের চরাঞ্চলের চরজানাজাত, কাঠালবাড়িসহ তিনটি ইউনিয়নে ব্যাপক নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে চরজানাজাত ইউনিয়নের ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়, মালেক তালুকদার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মজিদ সরকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি তিনটি বিদ্যালয় ভাঙন আক্রান্ত হয়েছে। নিলামের মাধ্যমে অর্ধ সহস্রাধিক শিক্ষার্থী সমৃদ্ধ ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয় ভবন সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। এখনো প্রাইমারি স্কুল ভবন সরানো শুরু হয়নি। তবে ভাঙন ও পানি বাড়ায় চরাঞ্চলে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কোনোমতে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা নিচ্ছেন শিক্ষকরা। এ দিকে ভাঙনের মুখে চরের অর্ধশতাধিক ঘর-বাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গেছেন আক্রান্তরা।

অবস্থার সত্যতা স্বীকার করে শিবচর ইউএনও ইমরান আহমেদ বলেন, এলাকার শিক্ষার্থীদের যাতে কোনোভাবে পড়াশুনায় ব্যাঘাত না ঘটে সে দিকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছে উপজেলা প্রশাসন।

"