ভুল নকশায় পানছড়িতে নদীভাঙন রক্ষা প্রকল্প বিলীন

এলজিইডির ভুল নকশা ও কাজে অনিয়মে সরকারের ৬০ লাখ টাকা জলে

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি

খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলায় নদীভাঙন রক্ষায় নির্মাণাধীন প্রতিরোধ দেয়াল কাজ শেষ না হতেই চেঙ্গী নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে গেছে। এরই মধ্যে প্রকল্পের আওতায় নির্মিত আরসিসি বা কংক্রিটের জমানো প্রতিরোধক দেয়াল (উইং ওয়াল) নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে আগে ক্রটিপূর্ণ নকশার কারণেই সরকারের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে গ্রামবাসী। প্রকল্পের নকশা ও গুণগতমান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এতে করে নদীভাঙন রক্ষা করা না গেলে সরকারের গচ্চা যাচ্ছে ৬০ লাখ টাকা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান চলমান প্রকল্পটি দিয়ে নদীভাঙন রক্ষা করা যাবে না। তবে এখন নতুন করে বড় আকারে প্রকল্প বা স্কিম নেওয়ার কথা ভাবছে বলে জানাচ্ছেন এলজিইডি কর্মকর্তা।

সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের নদীভাঙন রক্ষায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থয়ানে প্রকল্প নেওয়া হয়। পানছড়ি উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। চলতি বছরের অক্টোবর নাগাদ তা শেষ হওয়ার কথা। তবে প্রকল্প চলাকালীন নদীভাঙন রক্ষার প্রতিরোধ দেয়াল চেঙ্গীর স্রোতে বিলীন হওয়ায় প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুরু থেকে পরিকল্পিতভাবে নদীভাঙন রক্ষা প্রকল্প নেওয়া হলে এই ভাঙন হতো না। নদী স্রোত নিয়ন্ত্রণ না করে অহেতুক প্রকল্প নেওয়ায় সরকারের অর্থ ব্যয় হলেও তা কোনো কাজে আসেনি। প্রকৌশল বিভাগের নকশাজনিত ভুলের কারণে নির্মাণাধীন প্রতিরোধক দেয়াল ভেঙে গেলেও নদীর তীব্র স্রোত ও মাটিধসের কারণে প্রতিরোধ দেয়ালটি ভেঙেছে বলে তার ওপর দায় চাপান পানছড়ি উপজেলা প্রকৌশলী।

নির্মাণাধীন প্রকল্প নদীতে বিলীন হওয়া প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ি এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখতারুজ্জামান জানান, ‘নদীর স্রোতের কারণে কিছু অংশ বিলীন হয়েছে। এটি অস্থায়ীভাবে করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে আলাদ স্কিম নিয়ে কাজ করতে হবে।’ একই স্থানে দুইবার প্রকল্প নিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় প্রসঙ্গে জানান, ‘এটা পলিসি মেকাররা জানেন, আমরা ছোট চাকরি করি এসব বিষয়ে বলতে পারব না।’

সরেজমিনে জানা যায়, খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে পানছড়ির উত্তর শান্তিপুর গ্রামে চেঙ্গী খালে দেয়ালধসের ঘটনা ঘটে। উত্তর শান্তিপুর গ্রামের চেঙ্গী নদীভাঙন রোধে উদ্যোগ নেয় সরকার। জরুরি ভিত্তিতে এই কাজের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ লাখ টাকা। দরপত্র আহ্বানে কার্যাদেশ পায় হক এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে কাজটি পুনরায় কিনে নিয়ে বাস্তবায়ন করছে সুকুমার দাশ নামে এক স্থানীয় ঠিকাদার।

এরই মধ্যে ভাঙনকবলিত এলাকায় ১৪ ফুট দীর্ঘ আরসিসি (জমানো কংক্রিট) পিলার বসানো হয়েছে। পরে আরসিসি পিলারের ওপর লংবিমও বসানো হয়। প্রায় ৫০০ ফুট দীর্ঘ লংবিমের অর্ধেকের বেশি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া লংবিমের সঙ্গে লাগোয়ো প্রতিরোধক দেয়ালও চলে গেছে জলে। ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয়ার জানান, মানসম্মতভাবে কাজ করলে এত দ্রুত তা বিলীন হতো না। এতে ঠিকাদার লাভবান হলেও সরকারের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি গ্রামবাসী ভুগছে ভাঙন আতঙ্কে।

উত্তর শান্তিপুর গ্রামের বাসিন্দা কর্মধন চাকমা ও রঞ্জিতা চাকমা জানান, ‘কয়েক দিন আগেই এখানে নদীভাঙন রক্ষার কাজ করেছে। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তা আবার নদীতে বিলীন হয়েছে। নদীর যে অংশে ভাঙন ছিল না, আরসিসি পিলার খনন করায় সেখানেও ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধক বাঁধ স্থায়ীভাবে করা না হলে গ্রামটি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য খোকন কান্তি চাকমা জানান, ‘মাত্র ১৩-১৪ ফুটে পিলার দিয়ে নদীভাঙন রক্ষা করা যাবে। বর্ষায় পিলারের ২০-২৫ ফুট ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। এই প্রকল্প দিয়ে নদীভাঙন রোধ সম্ভব নয়। নতুন প্রকল্প নেওয়া না হলে নদীভাঙন রোধ করা যাবে না। এতে পুরো গ্রাম বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের আওতায় নির্মাণাধীন প্রকল্প নদীতে বিলীন হওয়া নিয়ে দায়সারা জবাব দেন পানছড়ি উপজেলা প্রকৌশলী তরুণ কান্তি দাশ। তিনি বলেন, ‘ল্যান্ড স্লাইড কিংবা ধসের কারণে প্রকল্পের প্রতিরোধক দেয়াল নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙন রোধে ব্লক দেওয়ার কথা থাকলে বৃষ্টির কারণে দেওয়া হয়নি। শুষ্ক মৌসুমে আবার কাজ শুরু করা হবে।’

"