লামায় মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে হাজারো বসতি

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

রিমন পালিত, বান্দরবান

বান্দরবানের লামা উপজেলার ৯০ ভাগ মানুষ পাহাড়ের চূড়া, পাদদেশ ও কোলঘেঁষে বসবাস করে আসছে। শত শত বছর ধরে এখানের ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সমতলের নদীভাঙা ও ভূমিহীন শ্রমজীবী বাঙালিরাও অর্ধশতাধিক বছর ধরে পাহাড় কেটে-খুঁড়ে আবাদি জমি তৈরি করে জীবনযাপন করে আসছে। কিন্তু বর্তমানে বর্ষা মৌসুম এলেই এ অঞ্চল পরিণত হয় আতঙ্কের জনপদে।

সাম্প্রতিক কয়েক দিনের মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতে শহর এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধস শুরু হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে পাহাড় ধস ট্রাজেডির পর এখনো রয়ে গেছে হাজার হাজার পরিবার। একের পর এক পাহাড় ধসে প্রাণহানির মতো মানবিক বিপর্যয় ঘটলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি পরিকল্পিত বসবাসের উদ্যোগ। এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারিদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়াও হয়নি এখনো। এদিকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিংয়েই সীমাবদ্ধ উপজেলা প্রশাসন ও পৌরসভার কার্যক্রম। ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যাপারে উদ্যোগ নেই কোনো সংস্থার।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে পাহাড় ধসের ঘটনার পর পরই প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা পাহাড়ের ঝুঁকিপুর্ণ বসতঘরগুলো সরানোর উদ্যোগ গ্রহণের পর সরকার পরিবর্তন ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সমন্বয়ের অভাবে তা আর বেশিদূর এগোয়নি। প্রতিবছর বর্ষা এলেই প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পাহাড়ে ঝুঁকিপুর্ণদের নিরাপত্তার তাগিদ দিয়ে অফিসের দায়সারা রুটিনওয়ার্ক শেষ করেন।

গণমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, পাহাড় ধসে ২০০৯ সালে আজিজনগর ও গজালিয়ায় এক পরিবারের ছয়জনসহ ১১ জন, ১৯৯৬ সালে পৌর এলাকার রাজবাড়িতে একই পরিবারের সাতজন, ২০১২ সালের ২৭ জুন রাতে ফাইতং ইউনিয়নে ২৫ জন, রুপসীপাড়া ইউনিয়নে দুজন ও সদর ইউনিয়নে দুজন, ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই লামা সদর ইউনিয়নে ছয়জন এবং সর্বশেষ গত মঙ্গলবার সরই ইউনিয়নের কালাইয়া পাড়া তিনজন মারা যান।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, জরিপে জেলার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে বসবাসকারী লামা উপজেলা হলেও পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে বসবাসরত পরিবারগুলোর কোনো নির্দিষ্ট তালিকা নেই প্রশাসনের কাছে। এ ছাড়াও ইউএনডিপি, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ অন্যান্য দাতা সংস্থাগুলো থেকে আসা হাজার কোটি টাকা প্রতিবছর তথাকথিত উন্নয়নের নামে ব্যয় দেখিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বর্ষাকালে ভয়াবহ পাহাড় ধস ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় দুর্যোগমুক্ত বিষয়ে মানবিক সহায়তা হিসেবে কোনো ধরনেরই আশ্রয় কেন্দ্র স্থাপনের কর্মসূচি নেই এসব সংস্থার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার আজিজনগর, ফাইতং, সরই, রুপসীপাড়া, সদর, গজালিয়া ও ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার পাহাড় কেটে অপরিকল্পিতবাবে ঘরবাড়ি তৈরি করে বসবাস করে আসছে তিন হাজারেরও বেশি পরিবার। আবার পৌরসভা এলাকায়ও এক হাজারের বেশি পরিবার পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের বেশির ভাগই হতদরিদ্র মানুষ। স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করা না হলে, পাহাড় ছাড়তে নারাজ এসব ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারী পরিবারগুলো।

লামা পৌরসভার বাসিন্দা জামাল, আনোয়ার হোসেন, বদিউর রহমান বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, এখানে সমতলের জমির দাম আকাশছোঁয়া। এত দামে আমাদের পক্ষে জমি কেনা অসম্ভব। পাহাড়ের জমি সমতল ভূমির চেয়ে অনেক সস্তা। তাই পাহাড়ের জমি কিনে বসবাস করছি।’ স্থানীয় সচেতন মহল জানিয়েছেন, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের পাহাড়ে শুধু মৃত্যুঝুঁকিতে বসবাস করছে তা-ই নয়, জীবনযাত্রায় পানি, আবহাওয়া, সামাজিক পরিবেশ, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ সুবিধাসহ নাগরিক কোনো প্রকার সুবিধা এরা ভোগ করতে পারছে না।

বান্দরবান মৃত্তিকা ও পানি সংরক্ষণ কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল আলমের মতে, অবাধে পাহাড় থেকে বৃক্ষ নিধন, পাথর উত্তোলন, পাহাড়ে উপযুক্ত চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ না করে জুম চাষ, পাহাড় কেটে ইটভাটা স্থাপনসহ প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি করায় পাহাড়গুলো ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া এখানকার পাহাড়গুলো পাললিক শিলা দ্বারা গঠিত, যা সহজেই ভঙ্গুর প্রকৃতির। তাই ভারী বর্ষণ হলেই পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। ফাইতং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. জালাল উদ্দিন ও সদর ইউপি চেয়ারম্যান মিন্টু কুমার সেন বলেন, অভাবি মানুষের পক্ষে সমতলে বসতি গড়ার সামর্থ না থাকায় পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসতি গড়ছে। তবে ঝুঁকিপুর্ণ পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার জন্য দফায় দফায় তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

লামা পৌরসভার মেয়র মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, পৌরসভা এলাকায় যারা পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন তাদেরকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য বার বার মাইকিং এর মাধ্যমে তাগাদা দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া আশ্রয় কেন্দ্রে খোলার পাশাপাশি আশ্রয়গ্রহীতাদের জন্য খাবার, পানি ও তাদের বাড়ি পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও কেউ যেতে চায় না।

প্রায় একই কথা বলেন লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূর-এ-জান্নাত রুমি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিংয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, তাছাড়া পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃপক্ষকেও ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদেরকে নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য তাগিদ দিতে বলা হয়েছে। এরপরও সরে না গেলে প্রশাসন কঠোরতা অবলম্বন করবে।

"