কালীগঞ্জের পাখাপল্লীতে ব্যস্ততা বেড়েছে কারিগরদের

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

হাসান জাকির, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)

বর্তমানে প্রচ- ভ্যাপসা গরমে এ অঞ্চলের জনজীবন অতিষ্ঠ। মাঝে মধ্যে বৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু গরম কমছে না। প্রচ- গরমে মানুষের বেহাল অবস্থা। তাই হাতপাখার কদর দিন দিন বাড়ছে। সেইসঙ্গে কালীগঞ্জের পাখা তৈরির কারিগরদের ব্যস্ততা বেড়েছে বহুগুণ। কারো যেন কথা বলার ফুরসত নেই। দিনরাত সবাই মিলে করছেন কাজ আর কাজ। কেউ পাতা কাটছে, কেউ করছে সাইজ, আবার কেউ করছে সেলাই, কেউবা করছে রং, আবার কেউবা তৈরিকৃত তালপাখা নিয়ে বাঁধছে বোঝা। বর্তমানে এ অঞ্চলের তৈরি পাখা ঝিনাইদহ ছাড়াও চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা, আলমডাঙ্গাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। তালপাতার পাখা তৈরির জন্য ঝিনাইদহ জেলার মধ্যে কালীগঞ্জ উপজেলা বিশেষভাবে পরিচিত। উপজেলার কোলা ও রায়গ্রাম ইউনিয়নের প্রায় দুই শতাধিক পরিবার পাখা তৈরি করে বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে অনেকটা স্বাবলম্বী। বর্তমানে তারা বাণিজ্যিকভাবে তৈরিকৃত পাখা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছেন।

সরেজমিন কালীগঞ্জ উপজেলার কোলা ইউনিয়নের পারিয়াট ও রায়গ্রাম ইউনিয়নের দুলালমুন্দিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কারিগররা স্বপরিবারে সবাই পাখা তৈরির কাজে ব্যস্ত। দুলালমুন্দিয়া গ্রামের মজনু, ফজলু, রহমত, বিল্লাল, গফুর, মান্নান, জিন্নাত, চাঁন মিয়া, নূর আলী, আব্দুল বারিক, মোস্তফা ও আব্দুর রহিম জানান, তাদের পূর্ব পুরুষেরা এই পাখা তৈরির কাজ করতেন। তাই পেশাটাকে ধরে রাখার জন্য এখনো তারা পাখা তৈরির কাজ করে যাচ্ছেন। আলাপকালে কারিগররা জানায়, হাত পাখা তৈরির প্রধান উপকরণ তাল পাতা।

শীত মৌসুমে নড়াইল, মাগুরা, ফরিদপুর ও রাজবাড়ী জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে তারা চারা গাছের পাতা কিনে আনেন। এরপর সেই পাতা রোদে শুকিয়ে পানিতে ভিজিয়ে রাখেন। পরে পানি থেকে উঠিয়ে নরম ভেজা পাতা গোলাকার করে কেটে মাঝখান থেকে দু-খ- করেন। একটি তাল পাতা থেকে দুটি পাখা তৈরি হয়। এরপর বোঝা বেঁধে পাতা ঘরে রেখে দেন। গরম মৌসুম এলে আবার পানিতে ভিজিয়ে নরম হলে পাখা তৈরির কাজ শুরু করেন।কারিগর মজনু মিয়া জানান, বছরে ২-৩ মাস তাল পাখার বেশি চাহিদা থাকে। চৈত্র থেকে শুরু করে জৈষ্ঠ্য মাস পর্যন্ত বিক্রির মৌসুম। এ সময়ে প্রচ- তাপদাহ ও লোডশেডিং হওয়ার কারণে তালপাখার কাটতি বেশি হয়ে থাকে। ফলে এ সময় তাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। বছরের অন্যান্য মাসে পানের বরজসহ তারা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি জানান, জন্মগত পেশা বলেই তাদের ছেলেমেয়েরাও বিভিন্ন নকশার পাখা তৈরিতে পারদর্শী হয়ে উঠেছে। পরিবারের ছোটরা পড়াশোনার পাশাপাশি পাখা তৈরির বিভিন্ন কাজ করে বড়দের সাহায্য করে।

নূর আলী নামের একজন কারিগর জানান, বিগত বছরগুলোর চেয়ে এ বছর একটি পাখাপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ৩ টাকা। কিন্তু লাভ হচ্ছে কম। কারণ বর্তমানে প্রতিটি জিনিসেরই দাম বেশি। তিনি জানান, প্রতিটি পাখা তৈরি পর্যন্ত প্রায় ৮ থেকে ১০ টাকা খরচ পড়ে। পাইকারী ব্যবসায়ীদের নিকট বিক্রি করতে হয় ১২ থেকে ১৫ টাকা।

গৃহবধূ জোছনা জানান, তারা পাখা তৈরি করেন কিন্তু শরীর ঘেমে মাটিতে পড়লেও বাতাস নেওয়ার সময় তাদের হয় না। কারণ, রান্নাবান্না ও গৃহস্থলীর কাজের পাশাপাশি তাদেরকে পাখা তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। পারিয়াট গ্রামের সলেমান মালিথার ছেলে আবদুর রাজ্জাক জানান, তাদের পরিবার প্রায় ২৫ বছর ধরে পাখা তৈরির কাজ করছেন। এ ছাড়া তাদের গ্রামের প্রায় শতাধিক পরিবার পাখা তৈরির সঙ্গে জড়িত।

রাজ্জাকের স্ত্রী রোকেয়া বেগম জানান, পাখা তৈরি করতে রং, সুতা, বাঁশ, কঞ্চি ও তালপাতার প্রয়োজন হয়। একজন কারিগর প্রতিদিন ৬০-৭০টি পাখা তৈরি করতে পারেন। ফলে প্রতিটি কারিগর বিক্রির মৌসুমে দিনে যাবতীয় খরচ বাদে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করতে পারেন। কোনো সরকারই তাদের দিকে নজর দেয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের পুঁজি কম। সরকার যদি পাখা কারিগরদের বিনামূল্যে ঋণের ব্যবস্থা করে দিত তাহলে এ শিল্পকে ধরে রাখা যেত। কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) উত্তম কুমার রায় বলেন, বিষয়টি আমরা অবশ্যই দেখব। তাদের কী ধরনের পুঁজির দরকার তার খোঁজ-খবর নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

"