আশুগঞ্জে সরকারি পুকুর ভরাট করছে ‘সুপার ফাইভ’ কমিটি

প্রকাশ : ১২ জুন ২০১৮, ০০:০০

মনির হোসেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে কতিপয় প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন একটি পুকুর ভরাটের অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদফতরের বিধি-নিষেধের তোয়াক্কা না করে এক মাস ধরে উপজেলা সদরের রেলস্টেশন এলাকায় সাইলো (খাদ্য গুদাম) সংলগ্ন পুকুরটি ভরাট করা হচ্ছে। ভরাটের জন্য ‘সুপার ফাইভ’ নামে একটি কমিটিও করেছে ওই প্রভাবশালী চক্রটি। চরচারতলা ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আইয়ুব খান ওই ‘সুপার ফাইভ’ কমিটির আহ্বায়ক। তার নেতৃত্বেই ভরাট কাজ চলছে বলে অভিযোগ।

পুকুর ভরাটে অভিযুক্ত চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ সভাপতি আইয়ুব খানসহ ‘সুপার ফাইভ’ কমিটির বাকি সদস্যরা হলেন, স্থানীয় শফিক ব্রাদার্সের শফিকুর রহমান, টুক্কু মিয়া, উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন ও মহিউদ্দিন মোল্লা।

সরেজমিনে মেঘনা নদী থেকে মোটা পাইপ দিয়ে বালু এনে আশুগঞ্জ সাইলো ও চরচারতলা উত্তরপাড়া কবরস্থান সংলগ্ন পুকুরটিতে ফেলতে দেখা গেছে। পুকুরটির ১৫ শতক খাদ্য মন্ত্রণালয়, ৩৬ শতক বাংলাদেশ কেমিকেল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন, উত্তরপাড়া কবরস্থান কমিটি ১০ শতক এবং চরচারতলা ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসা ৩০ শতক জায়গার মালিক। উপজেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনের (ভূমি) দেওয়া ভূমির ষোলাআনা মালিকানা নিরূপণ প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সম্প্রতি চরচারতলা উত্তরপাড়া কবরস্থান কমিটি তাদের পুকুরের নিজস্ব অংশ ভরাটের অনুমতি চেয়ে উপজেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করে। এ প্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (ভূমি) তার অফিসের সার্ভেয়ার দিয়ে চরচারতলা মৌজার ১৭৫১ দাগের ভূমির ষোলাআনা মালিকানা নিরূপণ করে একটি প্রতিবেদন দেন। এতে পুকুরটি খাদ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ কেমিকেল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন, উত্তরপাড়া কবরস্থান কমিটি এবং মাদরাসার মালিকানা দেখা যায়। তবে স্থানীয় প্রশাসনের চিহ্নিত করে দেওয়া কবরস্থান কমিটির জায়গা ১০ শতকের বদলে পুরো পুকুরই ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। এদিকে মে মাসের শুরুতে পুকুর ভরাটের কাজ শুরু হলে তার ১৫ দিন পর মো. লাল মিয়া সরকার নামে এক মুক্তিযোদ্ধার আবেদনের প্রেক্ষিতে পুকুর ভরাট বন্ধ করে দেন জেলা প্রশাসক। এর সপ্তাহখানেক পর আবারও ভরাট কাজ শুরু হয়।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, পুকুর ও কবরস্থানের পশ্চিমাংশে আশুগঞ্জ নদীবন্দরের জন্য আইসিটি টার্মিনাল নির্মিত হবে। এটিকে টার্গেট করেই কবরস্থান উন্নয়নের নামে পুকুর ভরাট করে সেখানে মার্কেট করার পরিকল্পনা করেছে প্রভাবশালী ওই ‘সুপার ফাইভ’ কমিটি। মূলত এ ‘সুপার ফাইভ’ কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন জালাল নামে একজন।

তবে জালালের দাবি, পুকুরের মধ্যে ১০৭ শতক জায়গার মালিক তারা। সবার সিদ্ধান্তে কবরস্থানের উন্নয়নের জন্য নিজস্ব জায়গাই ভরাট করা হচ্ছে। এটি সওয়াবের কাজ। সাংবাদিকদের কাজে সহযোগিতা করে ভরাট নিয়ে ‘উল্টাপাল্টা’ কিছু না লেখার জন্য বলেন তিনি।

‘সুপার ফাইভ’ কমিটির আহ্বায়ক আইয়ুব খান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অনুমতি নিয়েই তারা পুকুর ভরাট করছেন। তাছাড়া সরকারি দলের লোকজনও তাকে পুকুর ভরাট করার জন্য বলছেন। তবে অন্যায় কিছু করে থাকলে ভরাট বন্ধ করে দেবেন বলেও জানান তিনি।

সরকারি দলের লোকদের পুকুর ভরাটের অনুমতি দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌসুমি বাইন হীরা। এ নিয়ে বিএনপি নেতা জাকির হোসেন বলেন, ‘ভরাটের বিষয়ে আমি অবগত নই। আমি অবৈধ কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত নই। কবরস্থানের জায়গা ভরাট করা হচ্ছে জানি, তবে কতদূর ভরাট করা হচ্ছে সেটা জানি না।’

আশুগঞ্জ সারকারখানার উপ মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল বাকী বলেন, ‘পুকুরে আমাদের জায়গা রয়েছে। ভরাটকারীদের বাধা দিলে তারা বলছে, আমাদের জায়গা ভরাট করা হচ্ছে না।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মোসাব্বের হোসেন মোহাম্মদ রাজিব প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘পুকুর ভরাট শুরু করার পরই আমি তাদের নোটিস করেছি। যে জায়গা ভরাট করা হচ্ছে সেখানে আশুগঞ্জ সার কারখানা ও খাদ্য অধিদফতরের সাইলোর জায়গা রয়েছে।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক রেজওয়ানুর রহমান বলেন, কাউকে পুকুর ভরাটের অনুমতি দেওয়া হয়নি। সার কারখানা এবং সাইলো কর্তৃপক্ষকে বলেছি তাদের জায়গা তাদেরকে রক্ষা করতে হবে। ইউএনও তাদেরকে এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে চিঠি দিয়েছেন।

 

"