এক মাস ধরে অনুপস্থিত ৩২ জনপ্রতিনিধি

প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৮, ০০:০০

মহসীন শেখ, কক্সবাজার

দেশব্যাপী চলমান মাদক নির্মূল অভিযান শুরুতেই কক্সবাজারের টেকনাফ ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন অনেক জনপ্রতিনিধি। এদের অধিকাংশই পুলিশের ‘তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী’। আত্মগোপনে যাওয়া কেউ কেউ ওমরা পালনের নামে সৌদি আরব ও চিকিৎসার নামে ভারত পালিয়ে গেছেন। ফলে ভেঙে পড়েছে উপজেলার সামাজিক বিচার ব্যবস্থা আর নাগরিকসেবা বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয়রা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য ও পৌর কাউন্সিলরসহ একাধিক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির নাম রয়েছে।

মাদকের বিরুদ্ধে গত ৪ মে থেকে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সম্প্রতি টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হক নিহতের ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় শুরু হলে অভিযান অনেকটা কমে আসে। কিন্তু ইয়াবা ব্যবসায়ী অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিরা এখনো পলাতক রয়েছে। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য হচ্ছে, অভিযানের পর থেকে রাঘববোয়ালরা গাঢাকা দিলেও আরামে রয়েছে তালিকায় নাম না থাকা আরো কয়েকশত রাঘববোয়াল আর চুনোপুঁটি। এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে চলছে এ ব্যবসা। স্থানীয়রা এই প্রতিবেদককে জানান, প্রায় ১ মাস ধরে তাদের দেওয়া ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের খুঁজে পাচ্ছেন না। ঈদ উপলক্ষে সরকারের দেওয়া বিভিন্ন ত্রাণ থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়া উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতির কারণে জরুরি অনেক কাজ নিয়েও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এমনকি স্থানীয় সালিশ, ভেরিফিকেশন্স, জন্ম ও নাগরিক সনদের মতো প্রত্যাহিক জনগুরুত্বপূর্ণ কাজে সমস্যা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেকনাফে ইয়াবা বাণিজ্য সিংহভাগ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নিয়ন্ত্রণ করেন। এই ব্যবসা তারা নির্বাচিত হওয়া আগে থেকেই করে আসছে। ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে তারা আরো অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। মাদক কারবার করে অঢেল টাকার মালিক হন তারা। এক্ষেত্রে নিজেদের নিরাপত্তা, কারবারে নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির প্রয়োজনেই অবৈধ টাকা নিয়ে নির্বাচন অংশগ্রহণ করেছেন।

অভিযোগ আছে, তালিকাভুক্ত অধিকাংশই অতীতে নিম্নবিত্ত থাকলেও ইয়াবার ব্যবসায় করে অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন। আবার এদের কয়েকজন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এদিকে মাদকবিরোধী অভিযান একটু কমে আসতেই এলাকায় ফিরেছে মাদক কারবারের রাঘববোয়াল এক-দুইজন। সত্যতা স্বীকার করে নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক এক ইউনিয়ন সচিব এ প্রতিবেদককে জানান, মাদক নির্মূল অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে গাঢাকা দিয়েছে ইউনিয়নের কয়েকজন জনপ্রতিনিধি। এতে ইউনিয়নের বিয়ের সদন, জাতীয় সদন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড অনুমোদনের জন্য এলে তারা সেবা দিতে পারেন না। সরেজমিনে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে গিয়ে সচিবদের সঙ্গে কথা বললে জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন। গত এক মাস ধরেই উপস্থিতি নেই। ইউনিয়নগুলো হচ্ছে সদরের ইউনিয়ন, সাবরাং, হোয়াইক্যং, হ্নীলা, বাহারছড়ার ইউনিয়ন। এছাড়া টেকনাফ উপজেলা ও পৌরসভার অনেক জনপ্রতিনিধি অনুপস্থিতি সংকটে ভুগছে। অনুপস্থিত জনপ্রতিনিধিরা হলেন টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান শীর্ষ তালিকাভুক্ত ইয়াবা গডফাদার জাফর আহমদ, ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভী রফিক উদ্দীন, পৌরসভার ১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শাহ আলম, ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হোছন আহমদ, ৫নং কাউন্সিলর রেজাউল করিম মানিক, ৭নং কাউন্সিলর মাওলানা মুজিবুর রহমান, ৮নং কাউন্সিলর মনিরুজ্জমান লেড়– ও ৯নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নুর বশর নুরশাদ। টেকনাফ সদরের ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়া, ১নং ওয়ার্ড সদস্য ওমর হাকিম, ২নং ওয়ার্ডের মো. আবদুল্লাহ, ৪নং ওয়ার্ডের আজিম উল্লাহ, ৫নং ওয়ার্ডের আবু ছৈয়দ, ৬নং ওয়ার্ডের আবদুল হামিদ, ৮নং ওয়ার্ডের এনামুল হক ও ৯নং ওয়ার্ডের নজির আহমদ; সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে চেয়ারম্যান নূর হোসেন, ১নং ওয়ার্ডের মোয়াজ্জেম হোসেন দানু, ৩নং ওয়ার্ডের শামসুল আলম, ৬নং ওয়ার্ডের জাফর আলম; হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও ৭নং ওয়ার্ড সদস্য রাকিব উদ্দীন, ৬নং ওয়ার্ডের শাহ আলম, ২নং ওয়ার্ডের সিরাজুল মোস্তফা লাল্লু মেম্বার; হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ৮নং ওয়ার্ড সদস্য নুরুল হুদা, ৭নং ওয়ার্ডের জামাল উদ্দীন, ৩নং ওয়ার্ডের শামসুল আলম প্রকাশ বাবুল মেম্বার, ৯নং ওয়ার্ডের মোহাম্মদ আলী মেম্বার, সংরক্ষিত মহিলা মেম্বার আনোয়ারা বেগম ও মর্জিনা বেগম, বাহারছড়ার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মৌলভী আজিজ উদ্দীন, সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুর রউফ ও আবু বক্কর। ‘কমবেশি’ সমস্যার কথা স্বীকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবিউল হাসান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘অনুপস্থিত সবাই আমার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সদস্য নয় আর যেখানে চেয়ারম্যান অনুপস্থিত সেখানে প্যানেল চেয়ারম্যান-১ দিকে কাজ চালান হচ্ছে।’ নির্বাচনী এলাকায় দীর্ঘদিন জনপ্রিতিনিধি অনুপস্থিত থাকাকে আইনসঙ্গত নয় জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলে আমি সরকার ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষে বিষয়টি জানাব তারা এর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’

"