পাইকগাছা আশ্রয়ণ প্রকল্প

নেই কোনো নাগরিক সুবিধা থাকেন না দুস্থরা

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৮, ০০:০০

এস এম আলাউদ্দিন সোহাগ, পাইকগাছা (খুলনা)

খুলনার পাইকগাছায় ছিন্নমূল ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে বরাদ্দের আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলো নানা সংকটে দীর্ঘ দিন যাবৎ বসাবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ প্রকল্প যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকায় গড়ে উঠা, শুরু থেকে পানীয় জল, ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার জন্য বিদ্যালয় কিংবা বিদ্যুতায়নসহ নানা সংকটে দূর্ভোগের মুখে আশ্রয়ণবাসীরা বাধ্য হয়ে চলে যাচ্ছেন অন্যত্র। অনেক পরিবার ঘর বরাদ্দ নিয়েও বেশ আগে থেকেই বসবাস করছেন অন্যত্র। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন প্রকল্পবাসীদের অনেকে ক্ষোভের সাথে বলেন, তাদের প্রকল্পগুলো আধুনিক সমাজের অনেক দূরে অবস্থিত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, সমাজের বাইরে রাখতে যেন তাদের পরিকল্পিত পূণর্বাসনের মাধ্যমে রাখা হয়েছে কোনঠাঁসা করে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অবহেলিত জনপদের বঞ্চিত ভূমিহীন, দুস্থ ও অসহায় বিভিন্ন পরিবারের বসবাসের কথা চিন্তা করে সরকার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ১৯৯৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২৮টি আশ্রয়ণ প্রকল্প, গুচ্ছ ও আদর্শ গ্রামের নামে ভূমিহীনদের পূণর্বাসন করেছে। প্রকল্পগুলোর মধ্যে আশ্রয়ণ প্রকল্প রয়েছে ৩টি, আশ্রয়ণ প্রকল্প (ফেইজ-২) ১৫টি, গুচ্ছগ্রাম ৫টি, আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প ১টি ও আদর্শ গ্রাম রয়েছে ৩টি। এসব প্রকল্পে ১৪৪টি ব্যারাক ও ১ হাজার ৫৩০টি ঘর রয়েছে। সেখানে বসবাস করছেন ১ হাজার ২৪৭ পরিবার। বাকি ৩৩৩টি ঘর সমসংখ্যক পরিবারের মধ্যে বরাদ্দ থাকলেও সেখানে বসবাস করছে না কোন পরিবার।

উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ৩টি আশ্রয়ণ প্রকল্পে ২৬টি ব্যারাকে ২৬০টি ঘরের মধ্যে ১৭৩ পরিবার বসবাস করছে, খালী রয়েছে ৮৭টি ঘর। আশ্রয়ণ প্রকল্প (ফেইজ-২) এর ১৫টি প্রকল্পে ৯টি ব্যারাকে ৯২০টি ঘরের মধ্যে ৭৫৬টি পরিবার বসবাস করছে, খালী রয়েছে ২১৪টি ঘর। ৪টি গুচ্ছগ্রামে ১৬০টি ঘরের মধ্যে ১৩০ পরিবার বসবাস করছে, খালী রয়েছে ৩০টি ঘর। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ১৪ ব্যারাকে ৭০টি গরের মধ্যে ৬৮ পরিবার বসবাস করছে, খালী রয়েছে ২টি ঘর। ৩টি আদর্শ গ্রামে ১২টি ব্যারাকে ১২০টি ঘরের মধ্যে ১২০টি পরিবার বসবাস করছে।

সরেজমিনে জানা যায়, বেশিরভাগ আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণ করা হয়েছে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অথবা নদীর চরভরাটি এলাকায়। সেক্ষেত্রে অধিকাংশ প্রকল্পে যাতয়াতের কোন রাস্তা নেই। বেশিরভাগ প্রকল্প এলাকায় সেখানকার ছেলেমেয়েদের পড়া-লেখার জন্য কোন স্কুল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া প্রকল্পের বাসিন্দারা অধিকাংশই শ্রমজীবী হওয়ায় ঐ এলাকায় কাজের তেমন ব্যবস্থা না থাকায় বহুবিধ সংকটে আশ্রয়ণের ব্যারাক ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন অনেক পরিবার। বিশেষ করে উপজেলার বাইশারাবাদ, কলমিবুনিয়, আলোকদিয়া, বিল পরানমালী, হেতালবুনিয়া, হরিখালী, গাংরখী প্রকল্পগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। উপজেলার গড়ইখালীর গাংরখী আশ্রয়ণ প্রকল্পের সভাপতি সচিন সরদার বরেন, দীর্ঘ দিন যাবৎ সংস্কার না হওয়ায় বেশিরভাগ ঘর জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। নানা সংকটে ঘরগুলো এক প্রকার বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সরল আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাক্কার মিস্ত্রী জানান, প্রকল্পের প্রায় সব ঘরগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বিশেষ করে প্রকল্পে পানীয় জল ও বাথরুমগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে উপরন্ত সারাক্ষণ নানা রোগ-জীবাণূ ছড়াচ্ছে।

প্রকল্পের বাসিন্দা ইউছুপ আলী বলেন, তাদের প্রকল্পে সেখানকার অধিবাসীদের যাতায়াতের কোন রাস্তা নেই। জীবনের প্রয়োজনে বর্ষা মৌসুমে বাধ্য হয়ে হাঁটু পর্যন্ত কাঁদা পার হয়ে যাতায়াত করতে হয় তাদের। এমনকি তাদের প্রকল্প এলাকার কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে গড়ে ওঠেনি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

এ প্রসঙ্গে গড়ইখালী ইউপি চেয়ারম্যান রুহল আমিন বিশ্বাসের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গড়ইখালী বাজার সংলগ্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পটি নদী ভাঙ্গনে দীর্ঘ দিন ধরে হুমকির মুখে পড়েছে। ভাঙ্গান রোধে এখানে ব্যবস্থা না নিলে যে কোন সময় পুরো প্রকল্প গিলে খাবে প্রমত্তা শিবসা।

এ ব্যাপারে পাইকগাছা উপজেলা চেয়ারম্যান এ্যাড. স ম বাবার আলী বলেন, বেশির ভাগ আশ্রয়ণ প্রকল্পের জায়গা নির্ধারণে সুষ্ঠু পরিকল্পনার যথেষ্ট অভার ছিল। বেশির ভাগ প্রকল্প গড়ে উঠেছে ওয়াপদা বা বেড়িবাঁধের বাইরে। ফলে বর্ষা মৌসুম ও অতিরিক্ত জোয়ারে ডুবে যায় অনেক প্রকল্প। দীর্ঘ দিনেও বসবাসের উপযোগী পরিবেশ গড়ে না উঠায় বাসিন্দাদের অনেকেই ব্যারাক ছেড়ে বাধ্যতামূলক অন্যত্র চলে যাচ্ছে। তবে এসময় তিনি আরো বলেন, যে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানরা সহযোগীতা করলে আগামীতে প্রকল্পের বাসিন্দাদের বসবাসের জন্য উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফকরুল হাসান বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের উন্নয়নে তাদের বিশেষ কোন সুযোগ নেই। তবে একটি প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোন প্রকল্পের বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিলে বিষয়টি তাদের অবহিত করলে উর্দ্ধতন কতৃপক্ষর মাধ্যমে তার সমাধান করা হবে।

"