ক্রেতা না পেয়ে ধান নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন কৃষক

প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৮, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেক্স

ইরি-বোরো আবাদ শুরু থেকে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। অধিক ব্যয়ে উৎপাদিত ধান বিক্রি করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। সরকারিভাবে ধান-চাল ক্রয় শুরু হয়নি এখনো; অপরদিকে বাজারে এখনো আছে আমদানি করা চাল। আড়তদাররাও কৃষকের ধান-চাল কিনছেন না। ফলে উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম মূল্যে ধান-চাল বিক্রি করতে গিয়ে লোকসানের মুখে পড়ছেন কৃষকরা। তার পরও যশোরের কেশবপুর উপজেলায় ক্রেতা-শূন্যতায় বোরো ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। একই অবস্থা দিনাজপুরের পার্বতীপুর, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায়।

কেশবপুর উপজেলায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারে আমদানি করা চালের ব্যাপক জোগান থাকায় নতুন করে ধান কিনছেন না চালকল মালিকরা। এ কারণেই বাজারে ধান বিক্রি কম। আর দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার কৃষকরা বলছেন, ধানের বিক্রয় মূল্য কম হওয়ায় উৎপাদনের লক্ষ্যে বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে নেওয়া ঋণের টাকা পরিশোধ করতে বিপাকে পড়েছেন তারা। এদিকে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় কামলার ব্যয় দৈনিক ৬০০ টাকা হলেও প্রতি মণ ধানের দাম ৭০০ টাকা। আর রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা বাজারের ধান ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম জনান, মহাজনের কাছে ধানের চাহিদা না থাকায় মোটা ধান ৫৫০, চিকন ধান ৬০০ টাকায় ক্রয় করছি।

যশোর জেলা কৃষক সমিতির সম্পাদক মফিজুল রহমান নান্নু জানান, কৃষকের ঘরে ধান উঠলে তারা ধানের ন্যায্যমূল্য পাবেন না, এটা নতুন কিছু নয়। মধ্যস্বত্বভোগীরাই সব সময় লাভবান হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষকরা।

আমাদের যশোরের কেশবপুর উপজেলা প্রতিনিধি জানান, গত বুধবার শহরের ধানহাটায় সরেজমিন দেখা গেছে, বোরো ধান (মোটা) ৭০০ আর চিকন ৮০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতা না থাকায় বিক্রি করতে বাজারে নিয়ে ধান নিয়ে বাড়িতে ফেরত গেছেন অনেক কৃষক।

আলতাপোল গ্রামের ভ্যানচালক আবু সাঈদ বলেন, পরের জমি বর্গা নিয়ে বোরো ধানের চাষ করি। ধান নিয়ে আসছিলাম কেশবপুর বাজারে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা ধান না কেনায় বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। যে ধান এক সপ্তাহ আগে ছিল ৮৫০ টাকা, এখন তা ৮০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করছেন। তার পরও ব্যবসায়ীরা নিতে চাচ্ছেন না।

কেশবপুর ধান বাজারের ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান বিশ^াস বলেন, সাধারণত এ সময় পাবনা, কুষ্টিয়া খাজানগর ও ঈশ^রদী থেকে চালকল মালিকরা এসে ধান কিনে নিয়ে যেতেন। এ বছর তাদের কারও কোনো খোঁজ নেই।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মহাদেবচন্দ্র সাহা বলেন, এ বছর উপজেলার ১৬ হাজার ৮৯০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ৮ হাজার ৬৩৫ মেট্রিক টন ধান। ধানের দাম কমে যাওয়া একটি সমস্যা। এ কারণে কৃষকরা লাভবান হবেন না।

এদিকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলা প্রতিনিধি জানান, চলতি বছরের নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও পরিচর্যার মাধ্যমে আশানুরূপ বোরো ফলিয়েছেন উপজেলা কৃষক। উপজেলার যশাই হাট, আমবাড়ি, হাবড়া, বেনীর হাট ও পুরাতন বাজার হাট ঘুরে দেখা গেছে, আগাম ব্রি-২৮ জাতের ধান ৪৮০ থেকে ৫০০, মিনিকেট ৫২০ টাকা থেকে ৫৫০ টাকা দরে প্রতি মণ ধান বিক্রি করছেন কৃষকরা। অপরদিকে ধান ক্রয়কারী স্থানীয় পাইকাররা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারে ধানের দাম কম, এই অজুহাতে ৪৫০ থেকে ৪৭০ টাকা দরে কৃষকের বাড়ি থেকে ধান ক্রয় করছেন।

পার্বতীপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর উপজেলায় এক লাখ ৫০ হাজার ৫০০ হেক্টর ইরি-বোরোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আগাম জাতের ২৫ ভাগ ধান ঘরে তোলা সম্ভব হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বাকি ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হবে।

এদিকে সিরাজঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলা প্রতিনিধি জানান, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সব এলাকাতেই ইরি ধানের ভালো ফলন মিলছে। বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা ধানের বর্তমান দাম কম বলছে। একাধিক ধান ব্যবসায়ী ও চাতাল মালিকদের বক্তব্য, হাট থেকে ধান কিনে এনে শুকানোর পর তা ৭২০ থেকে ৭৫০ টাকা মণ দরে পড়ছে। এদিকে গত ২ মে থেকে সরকারিভাবে ধান ও চাল ক্রয়ের ঘোষণা থাকলেও উল্লাপাড়ায় এখনো তা শুরু হয়নি।

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, এবারের মৌসুমে উল্লাপাড়ায় মোট ৮৫১ মেট্রিক টন চাল কেনা হবে। এজন্য মোট ৫৩ জন চালকল মালিকের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। আগামী ক’দিনের মধ্যেই এ চাল কেনা শুরু হবে। তবে এখনো ধান ক্রয়ের কোনো নির্দেশনা পাননি বলে জানান।

এছাড়া রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রতিনিধি জানান, চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে এ উপজেলায় ১১ হাজার ১শ ৪৬ হেক্টর জমিতে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও উপজেলায় চাষাবাদ হয়েছে ১১ হাজার ৫শ ৫০ হেক্টর জমিতে। কিন্তু শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটা মাড়াই খরচ পরিশোধ করতে কম মূল্যে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে বর্গা চাষীরা। এদিকে উপজেলা ধান ক্রয় বরাদ্দ না থাকায় লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা। সরকারিভাবে প্রতি কেজি চালের মূল্য ৩৮ টাকা নির্ধারণ করেছে। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আব্দুল জলিল ব্যাপারী বলেন, এ উপজেলায় ৫২৫ মেট্রিক টন চাল ক্রয়ে জন্য ১ মে শুরু করার কথা থাকলেও আগামী ২০ মে’র মধ্যে মিলারদের সাথে চাল ক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর চাল সংগ্রহ শুরু হলে বাজারে ধানের দাম বৃদ্ধি হবে।

"