শতবর্ষী মুছাপুর খাল দখল করে এক কুড়ি স্থাপনা

প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৮, ০০:০০

জুয়েল রানা লিটন, নোয়াখালী ও গিয়াস উদ্দিন রনি, কোম্পানীগঞ্জ

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের শতবর্ষী মুছাপুর খাল দখলের মহোৎসব চলছে। উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের বাংলাবাজারের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে জেলা পরিষদের এই খাল। খাল দখলে স্থানীয় প্রভাবশালীসহ ডাক্তার, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যও আছে। তবে এসব খাল রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন, জেলা পরিষদ এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেই কোনো পদক্ষেপ। অভিযোগ উঠেছে, সব জেনে-বুঝেও স্থানীয় প্রশাসন নীরব। তাই দখলের কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে মুছাপুর খালসহ উপজেলার খালগুলো।

দখলদারদের একজন গোলাম সরওয়ার দাবি করেন, ‘আমি জেলা পরিষদ থেকে খালের ওপর বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি নিয়েছি। জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী সরেজমিন এসে বছরে সরকারকে চার হাজার টাকা দেওয়ার নিমিত্তে এই জায়গা আমাকে বরাদ্দ দেয়।’

শতবর্ষী মুছাপুর খালের দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার। জেলার সদর ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সীমান্ত থেকে শুরু হয়ে ছোট ফেনী নদীতে গিয়ে পড়েছে। মুছাপুর ইউনিয়নের অশীতিপর এক বৃদ্ধ ও ইউনিয়ন পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির এক নেতাসহ স্থানীয় অনেকে নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, শতবর্ষ আগে মুছাপুর খালটি খনন করা হয়। সদরের সঙ্গে কোম্পানীগঞ্জসহ দাগনভূঁইয়া ও আশপাশের উপজেলার যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল এই খাল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্রে জানা যায়, এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি জেলা পরিষদ থেকে শুধু চলাচলের রাস্তা করার অনুমতি এনে শর্ত ভেঙে বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলো নির্মাণ করছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, খালের ওপর অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকারীদের মধ্যে অন্যতম মুছাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা হাসান, ক্যাপ্টেন বজলুর রহমান, নুরু মেস্তরী, মাইন উদ্দিন, ডা. শিবলী নোমান, সাহাব উদ্দিন প্রমুখ।

সরেজমিন দেখা যায়, দখলের কারণে নাব্য হারিয়ে মুছাপুর খালটি ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে গেছে, ফলে বর্ষায় এই খাল দিয়ে পানি প্রবাহ মারাত্মক ব্যাহত হয়। তাছাড়া শুষ্ক মৌসুমে কৃষি ও সেচ কাজে সংকটের সৃষ্টি হয়। যা স্থানীয়ভাবে পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমানে খালের কোথাও ১৬, ১৮, ২০ ফুট প্রস্থ দেখা গেছে। বাকিটা দখল ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হারিয়ে গেছে। খালের লোভনীয় বিভিন্ন স্থান দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ২০টি বাণিজ্যিক স্থাপনা। কিছু প্রভাবশালী মহল এখনো স্থাপনা নির্মাণের পাঁয়তারা করছে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানও এই তথ্য স্বীকার করেন।

উপজেলা কৃষি অফিসার পুষ্পেন্দু বড়–য়া জানান, পাড় দখল ছাড়াও খালের ওপর সø্যাব, খুঁটি দিয়ে ঘর নির্মাণ করলে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এটাকে দখল মুক্ত করাতে হবে। তিনি জানান, মুছাপুর খালের দুই পাড়ে পাঁচ শতাধিক পরিবার আছে, যারা খালের ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া প্রায় ৩৫০ হেক্টর জমির চাষাবাদ এই খালের পানির ওপর নির্ভর করে।

খালের ওপর স্থাপনা নির্মাণকারী গোলাম সরওয়ার দাবি করেন, তার একটি স্থাপনা ছাড়া আরো ২০টি বাণিজ্যিক স্থাপনা মুছাপুর খালের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে। যেগুলোর কোনো বৈধ অনুমতি নেই।’ তবে তার এই দাবি নাকচ করে দিয়ে এলাকাবাসী উল্টো অভিযোগ করেন, স্থাপনা নির্মাণকারী গোলাম সারওয়ার তথ্য গোপন ও জেলা পরিষদের অনুমতির শর্ত ভঙ্গ করে মুছাপুর খালের ওপর অবৈধ বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করেছে।

এ বিষয়ে নোয়াখালী জেলা পরিষদের নির্বাহী প্রধান ড. মাহে আলম জানান, পানি চলাচালে বিঘœ সৃষ্টি করে খালের ওপর বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা খাল দখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব। তিনি আরো বলেন, এর আগেও আমি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) বলেছি খালের ওপরের অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করার জন্য।

জানতে চাইলে কোম্পানীগঞ্জ ইউএনও মো. জামিলুর ইসলাম বলেন, মুছাপুর খালটি জেলা পরিষদের রেকর্ডভুক্ত। তাই জেলা পরিষদের সঙ্গে কথা বলে খাল দখল মুক্ত করতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

"